iDxJmGLYdGEv

আনোয়ার সাহেবের দল হাশিম সাহেবকে দেখতে পারতেন না। কিন্তু শহীদ সাহেবের ভক্ত। ছিলেন। শহীদ সাহেব অবস্থা বুঝে আমাদের দুই দলের নেত্রিব্রিন্দকে ডাকলেন একটা মিটমাট করাবার জন্য। শেষ পর্যন্ত মিটমাট হয় নাই। এই সময় শহীদ সাহেবের সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। তিনি আনোয়ার সাহেবকে একটা পদ দিতে বলেন, আমি বললাম কখনোই হতে পারে না। সে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোটারি করেছে, ভাল কর্মীদের জায়গা দেয় না। কোনো হিসাব-নিকাশও কোনোদিন দাখিল করে না। শহীদ সাহেব আমাকে হঠাত বলে বসলেন, “Who are you? You are nobody.” আমি বললাম, “If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody. Thank you Sir. I will never come to again.”
এ কথা বলে চিৎকার করতে করতে বৈঠক ছেড়ে বের হয়ে এলাম। আমার সাথে সাথে নুরুদ্দিন, একরাম, নূরুল আলমও উঠে দাঁড়াল এবং শহীদ সাহেবের কথার প্রতিবাদ করল। বর্তমান বুলবুল একাডেমির সেক্রেটারি মাহমুদ নূরুল হুদা সাহেব শহীদ সাহেবের খুব ভক্ত ছিলেন। সকল সময় শহীদ সাহেবের কাছে থাকতেন। আমরা তাঁকে ‘হুদা ভাই’ বলে ডাকতাম। হুদা ভাইয়ের ব্যবহার ছিলো চমৎকার। কারও কোনো বিপদ হলে, আর খবর পৌঁছে দিলে যত রাতই হোক না কেন হাজির হতেন। হুদা ভাই ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন। আমি যখন বিখ্যাত ৪০ নম্বর থিয়েটার রোড থেকে রাগ হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম শহীদ সাহেব হুদা ভাইকে বললেন, “ওকে ধরে আনো।” রাগে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। হুদা ভাই দৌড়ে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। শহীদ সাহেবও দোতলা থেকে আমাকে ডাকছেন ফিরে আসতে। আমাকে হুদা ভাই ধরে আনলেন। বন্ধুবান্ধবরা বলল, “শহীদ সাহেব ডাকছেন, বেয়াদবি কর না, ফিরে এস।” উপরে এলাম। শহীদ সাহেব বললেন, “যাও তোমরা ইলেকশন কর, দেখ নিজেদের মধ্যে গোলমাল কর না।” আমাকে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, ” তুমি বোকা, আমি তো আর কাউকেই একথা বলি নাই, তোমাকে বেশি আদর ও স্নেহ করি বলে তোমাকেই বলেছি।” আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি যে সত্যিই আমাকে ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত। যখনই তাঁর কথা এই কারাগারে বসে ভাবি, সেকথা আজও মনে পড়ে। দীর্ঘ বিশ বৎসর পরেও একটুও এদিক অদিক হয় নাই। সেইদিন থেকে আমার জীবনে প্রত্যেকটা দিনই তাঁর স্নেহ পেয়েছি। এই দীর্ঘদিন আমাকে তাঁর কাছ থেকে কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে নাই এবং তাঁর স্নেহ থেকে কেউই আমাকে বঞ্চিত করতে পারে নাই।

শহীদ সাহেবের বাড়িতে দুই দল বসেও যখন আপোষ হল না, তখন ইলেকশনে লড়তে হবে। ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের সাহায্য নিয়ে দখল করতে সক্ষম হলেন। খান বাহাদুররা জেলা লীগ কনফারেন্সে পরাজিত হলেন। ১৯৪৩ সাল থেকে চট্টগ্রামের এই কর্মীদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, আজ পর্যন্ত সে বন্ধুত্ব অটুট আছে। চট্টগ্রামের এম. এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, আজিজুর রহমান, ডা. সুলতান আহমেদ (এখন কুমিল্লায় আছেন), আবুল খায়ের চৌধুরী এবং আরও অনেক ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অনেকেই ছিটকে পড়েছেন। আজিজ ও জহুর আজও সক্রিয় রাজনীতি করছেন। জহুর শ্রমিক আন্দোলন করেন এবং সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি। এম. এ আজিজ (এখন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) পাকিস্তান হওয়ার পরে অনেকবার ও অনেক দিন জেলে কষ্ট ভোগ করেছেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব তখন এদের নেতা ছিলেন। পরে তিনি মুসলিম লীগেই থেকে যান। আজিজ ও জহুর আওয়ামী লীগে চলে আসেন। চৌধুরী সাহেব খুবই স্বার্থপর হয়ে ওঠেন এবং একগুঁয়েমি করতেন, সেজন্যে যারা চট্টগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পরে তারা সকলেই তাঁকে ত্যাগ করেন।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান। (পৃষ্ঠা নং- ২৮ ও ২৯)

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব-২১)

১৮৪০জন ১৮৩৯জন
0 Shares

৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ