প্লেন বাড়ী

নীলাঞ্জনা নীলা ২ নভেম্বর ২০১৪, রবিবার, ০৯:১১:০১পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৪ মন্তব্য

নামটা শুনেই কেমন লাগছে , তাই না ? প্লেনের আবার বাড়ী হয় নাকি ? অনেক অসম্ভবের মধ্যে অনেক কিছুই সম্ভব হয় । আমার একটা সমস্যা আছে , যা অনেকেরই বিরক্তি ধরিয়ে দেয় । কথার মধ্যে থেকে অন্য কথায় প্যাঁচাল পারা । এখন যেমন বলতে যাচ্ছি । অনেক ছোটবেলা থেকেই বেড়াতে গেলে বিভিন্ন দিকে চোখ চাইতো । এজন্য হোঁচট কম খাইনি , সাথে বাপির বকাও । কেন যেদিকে পা ফেলছি , সেদিকে দেখছি না । যাক পড়তে পড়তেও আশ্রয়টুকু আমায় জড়িয়ে নিতো । কতো কিছু যে দেখা হয়ে যেতো ওটুকুর মধ্যে । মনে আছে একদিন চায়ের পাতায় ছোট্ট একটা নীল রং-এর পোকা দেখেছিলাম । আজও জানিনা ওটার নাম । কিন্তু ঠিক মনে আছে । অনেক সুন্দর ছিলো । বেড়াতে যাওয়া মানেই আনন্দ । তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি , অথচ মনে আছে বেড়িয়ে যখন বাপি-মামনির সাথে বাসার দিকে ফিরতাম । চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসতো । অন্ধকারের ভেতর সাধু বুড়ার হাতে হারিকেন আর বাপির হাতে টর্চ লাইট মাটির সরু পথটায় যখন পড়তো , সারাটি চা’ বাগান যেনো সেজে উঠতো । যখন আর চাইতে পারতাম না , দাঁড়িয়ে পড়তাম নিশ্চিন্তে । কারণ জানি , বাপি এবার ঠিক কোলে নেবে । হতোও তাই । বাপির ঘাড়ে মাথা রেখেই ঘুম । নাদুস-নুদুস ছিলাম…মানে ভারী বাচ্চা । সকালে চোখ মেলে দেখতাম আরে কি করে বিছানায় !

এবার আসি প্লেন বাড়ীর কথায় । শমশেরনগর থেকে বাসে করে সিলেট যাবার পথটা একসময় আমার মুখস্থ ছিলো । অনেকের চোখে যা পড়েনি , আমার চোখে পড়তোই পড়তো । যদিও এখন জানতে চাইলে কিছুই বলতে পারবোনা । প্রথম যখন বাসে করে সিলেট যাই আমি আর কুমকুম আপু । মৌলভীবাজার পার হলেই শেরপুর । ঠিক তারপরেই একটা বাড়ী , যেটা চোখে না পড়ে যায়না কারো । জানিনা বাড়ীর মালিক কে । তবে ওটার নাম দিয়েছিলাম (হয়তো এ নামেই পরিচিত ছিলো) প্লেন বাড়ী । ভেবে পাইনি প্রথমে বাড়ীর ছাদে একটা প্লেন কেন ? পড়ে বুঝেছি লন্ডনী মালিক । সিলেটী মানেই তো লন্ডনী । আমি আর কুমকুম আপু হাসতে হাসতে শেষ । বললাম শোনো আমি তো কানাডা যাবোই , তখন বাড়ীর ছাদে একটা জলপ্রপাত বানাবো । ওটার নাম দেবো কানাডা ফলস । সবাই জানবে আমি কানাডায় থাকি । কুমকুম আপু বললো , “আমি তো আমেরিকায় যাবো , স্ট্যাচ্যু অব লিবার্টি ছাদের মাথায় থাকবে । সবাই বলবে আমেরিকার কুমকুম ।” বাসের মধ্যে কতো হিজিবিজি গল্প হায়রে । কে কি ভাবলো , কে আমাদের হাসি দেখলো ওসব দেখার সময় কই আমাদের ? তো সেই প্লেন বাড়ী নিয়ে অনেক রকমের বিদ্রূপাত্মক কথার ফুলঝুরি । হাসির জন্যে বিষয় লাগতো না তখন । প্লেন বাড়ী বললেই হাসি । আমাদের বান্ধবী রীতাকে বলতাম তোদের বাড়ীর ছাদে ব্রান্ডেনবার্গ গেট বানাতে বলিস দাদাকে । কারণ ওর বড়ো ভাই থাকতেন জার্মানীতে । ওহ এসব নাম কিভাবে পেয়েছি ? আরে আমার যে ভ্রমণ কাহিনী খুউব প্রিয় । কানাডায় আসিনি যখন , সেই ১৯৯৩ সালেই টরেন্টো আর মন্ট্রিলের অনেক অনেক পথ জানা হয়ে গিয়েছিলো । আমার বান্ধবী রুমার বোন ঝুমাদি সাক্ষ্মী ।

যাক প্লেন বাড়ীটার কথা আজ কেন লিখলাম ? কাজ থেকে ফিরছি , ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে ছিলাম বাসের অপেক্ষায় । দেখলাম বাস যতোক্ষণে আসবে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে এখানেই আমার ফুনারেল হবে । যা ঠান্ডা । হাঁটা শুরু করলাম । হঠাৎ দেখি একটা ছাদের উপর প্লেনের মতো । দেখেই এমন হাসি পেলো , যে ওখানেই মুখে হাত চেপে হেসে নিলাম । দু’-একজন মানুষ আমায় পাগল ভেবে চেয়ে চেয়ে দেখে গেলো । হাসি আর কাশি দুটোই শুরু হলো এবার একসাথে । স্মৃতি নাকি শুধু কাঁদায় , কে বলেছে ? অনেক হাসায়…এমনই হাসাতে পারে যে চলতি জীবনের জটিলতাকে দূর করিয়েও দিতে পারে । স্মৃতির অসীম ক্ষমতা , আর তাইতো প্লেন বাড়ীর পরে সিলেটের কাছাকাছি একটা প্লেন গেটও আছে আর অনেক পেছনে বাড়ী সেটাও মনে আছে । তবে প্লেনবাড়ীটার জন্যে কষ্ট হয় । ১৯৯৩-১৯৯৭ সাল , এ কয়টি বছর দেখেছি ওটাকে । শেষের দিকে যখন অনার্স প্রায় শেষের পথে । বাসায় ফেরার সময় বাসে বসেই দেখলাম প্লেনবাড়ীটার রঙ ক্ষয়ে গেছে । হয়তো আর্থিক সেই অহঙ্কারে ভরা বাড়ীটা , লন্ডনী পরিচিতির পতাকা তোলা বাড়ীটাতে কেউ আর থাকেনা । নয়তো আমার ধারণা ভুল । কি জানি !

 

আমাদের কিছু সময় চলে গেছে
জলের তোড়ে
সবুজের ভীড়ে
আলোর ঝিলিকে
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে ।

আমাদের না বলা কথা থেকে গেছে
মৌণতার নূপুরে
ভোরের শিশিরে
পথের আগাছায়
ফুলেল উপমায় ।

আমাদের অনেক কিছুই বদলে গেছে
কিছু থেমে গেছে
কিছু জমে আছে
আমাদের নীরবতায়
আর প্রাণোচ্ছ্বলতায় । (কবিতাটি লেখা হয়েছে ৮ আগষ্ট , ২০১৪ ইং তারিখে)

 

হ্যামিল্টন , কানাডা
১-লা নভেম্বর , ২০১৪ ইং ।

 

পরিচিতি :

কুমকুম আপু – আমার বড়ো বোন , বন্ধু , অভিভাবক…

রীতা/রুমা – বন্ধু

৪৬৫জন ৪৬৫জন
0 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ