প্রজ্ঞা ৫

নীরা সাদীয়া ২৭ অক্টোবর ২০১৬, বৃহস্পতিবার, ০৯:১০:৫৫অপরাহ্ন গল্প ১৮ মন্তব্য

fb_img_1476726501749

ডাইনিং টেবিলে রোহান বসে আছে চায়ের অপেক্ষায়। রিয়া চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার চা”
রোহান রাগে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
“মা,আমি চা খাবনা।”
বলে উঠে চলে গেল।রিয়া বিষন্ন মুখে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকল।অবশ্য এটা তার কাছে নতুন নয়।রোহান তার সাথে এরকম ব্যবহার প্রায় সবসময় করে।তাকে রোজই প্রচুর অবহেলা আর অসম্মান সইতে হচ্ছে।আর এদিকে কে বা কারা তার এ অবস্থার জন্য দায়ী তাদের খোঁজ সে কিছুতেই পাচ্ছে না।কখনো মনে হচ্ছে পুরোটাই কোন ভুল বোঝাবুঝি।আবার কখনো মনে হচ্ছে রোহান এসব ইচ্ছে করে করছে।তার হয়ত অন্য কোথাও পছন্দ আছে।আর কিছু সে ভাবতে পারছেনা। যখনি কিছু ভাবতে যায়,ভাবনারা সব এলোমেলো হয়ে তার মাথায় চেপে বসে।মাথা ঘুরতে থাকে।ধীরে ধীরে নিজেকে সে রোহানের সামনে থেকে আড়াল করে নিচ্ছে। কারন রোহান তাকে দেখলেই চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করে।অসহনীয় ব্যবহার করে।তাই যত আড়ালে থাকা যায় ততই ভাল।রোহান বলে দিয়েছে তার মুখ দেখতে চায়না।
.
এভাবেই শশুড় বাড়িতে কাটছিল রিয়ার দিনগুলি।ছয় তলা এ বাড়িটাতে মাটি নেই,গাছ নেই,বাড়ান্দায় কেবল প্রখর রোদ। রিয়ার রুমে আকাশ দেখার মত খোলা বাতায়ন নেই।তাই তার খুব দম বন্ধ লাগে।মন চায় যেখানে খুশি চলে যেতে।কিন্তু সাথে করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে আস্ত একটি শরীর,যা থেকে তার কোন মুক্তি নেই।আর এই শরীরটাই ডেকে আনতে পারে মহাবিপদ।তাই মন চাইলেও অনেক কিছু করতে নেই।এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ান্দায় এসে বসল সে।রোদ কমে তখন একটা সহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে।বসে বসে আকাশ পাতাল গন্তব্য নিয়ে ভাবছে,এমন সময় দরজায় কলবেল বাজছে।রিয়াই কাছে ছিল তাই সে খুলে দিল।দেখল রোহান ফিরেছে।ঘরে ঢুকেই প্রথমে রিয়াকে দেখতে হল,তাই তার মাথা গরম হয়ে গেল।দরজা দিয়ে না ঢুকে আবার বেড়িয়ে গেল।অফিসে গিয়ে বদলীর জন্য দরখাস্ত করে এল।কিন্তু বাড়িতে কিছুই জানাল না।অতপর একমাসের মধ্যেই সকল তদবির হয়ে ঢাকা থেকে খুলনায় বদলীর ব্যবস্থা হয়ে গেল।এবার রোহান তার মাকে জানাল, যতদিন রিয়া এবাড়িতে থাকবে ততদিন সে ফিরবে না।
.
রোহান চলে গেছে।তার মা নীরবে চোখের জল ফেলেন।একজন মায়ের চোখের জলের কারণ রিয়া নিজে,এটা ভেবে সে খুব অস্বস্তিতে ভোগে।তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে সে এখান থেকে চলে যাবে।আর কোনদিন ফিরবে না।কিন্তু যতদিন না চাকরি হচ্ছে সে কটা দিন এখানে থাকবে।যেই ভাবা সেইমত সব গোছাতে লাগল।সে সংসার থেকে কেমন আলগা আলগা থাকে।সংসারের কোন ব্যাপারে নিজেকে জড়ায় না।দু তিনটে টিউশন পড়ায় এবং সেই টাকা দিয়ে নিজের খরচ চালায়।কিন্তু রোহানের পাঠানো সংসার খরচের টাকা থেকে এক টাকাও নেয় না।মাঝে মাঝে হাঁটতে কষ্ট হবে বলে শাশুড়ি খুব জোর করে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেন আর বলেন,
“একটা রিকশা নিয়ে চলে যেও”
বয়স্ক মানুষটাকে কষ্ট দিতে পারবে না বলে বাধ্য হয়ে টাকাটা নেয়,কিন্তু যাওয়ার আগে বিছানার ভাঁজে টাকাটা গুঁজে রেখে যায়।এমনকি রোহানের আয় করা পয়সা থেকে সকাল দুপুর ভাত খেতে নিলেও সেটা তার গলা দিয়ে নামে না। কেন যেন রোহানের প্রতিও তার একটা ঘৃণার পাহাড় বিন্দু বিন্দু করে তৈরি হচ্ছে।রোহান চলে যাবার পর একটা দিনের জন্যও সে তাকে এটা ফোন করেনি।সারাক্ষন চিন্তায় অস্থির থাকে কি করে একটা চাকরি মিলবে, কি করে নিজের একটা থাকার ব্যবস্থা করতে পারবে,কবে মুক্তি মিলবে এই জানালাবিহীন আলো বিহীন বদ্ধ ঘরটি থেকে।
এভাবে প্রাণপন চেষ্টা করতে করতে একবছর কেটে গেল।চাকরি কি অত সোজা?অনেক কাঠখর পোড়ানোর পর একদিন সত্যিই মিলে গেল একটা চাকরি।রিয়ার আনন্দ আর দেখে কে? চাকরির খবর পেয়েই বাড়ি না ফিরে নেমে পড়ল রাস্তায় টু লেট দেখতে।কিন্তু আরেক বিপত্তি হল।যেখানেই যায়,বাড়িওয়ালা একা একটি মেয়েকে ভাড়া দিতে চায় না।ফলে উপায় না দেখে সে মহিলা কর্মজীবী হোস্টেলে গেল সিটের সন্ধানে।সেখানেও সিট খালি নেই।তবে আশার কথা হল সামনের মাসে একটা সিট খালি হবে।রিয়াও ভেবে দেখল,বর্তমানে হাত পুরো খালি।হোস্টেলে উঠতে হলে অগ্রিম টাকা দিতে হবে।তাই সামনের মাসে বেতনটা পেয়ে ওঠাই ভাল।এতদিন যেহেতু কষ্ট করেছে,আর কটাদিন তো করাই যায়।বাড়ি ফিরে শাশুড়িকে জানাল সংবাদটা।অফিসে নিয়মিত যাওয়া আসা করতে লাগল, আর সেই সাথে তার দিনগোনা শুরু হল।কবে কাটবে একমাস,কবে উঠবে তার আপন বাড়িতে,আপন ঠিকানায়,যে ঠিকানা একেবারে তার নিজস্ব,নিজের অর্জিত।
.
রোহান খুলনায় একা থাকে।ফলে তেমন একটা নিয়ম কানুনের ধার ধারে না।অফিস সেরে সেই তিন বন্ধুর সাথে চলে আড্ডাবাজি।তার বন্ধুরা এখনো চাকরি বাকরি যোগাতে পারেনি।তারা বেকার,তাই যথেষ্ট সময় আছে হাতে।তারা রোহানের ভাড়া করা এপর্টমেন্টে থাকছে খাচ্ছে।
আজ সে অফিস থেকে দ্রুত ফিরল বন্ধুদের নিয়ে একটু শপিং এ যাবে বলে।তারা সেটা জানত না যেহেতু রোহান হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।চার বন্ধুর কাছেই এপার্টমেন্টের একটা করে চাবি থাকে।রোহান তার চাবি দিয়ে তালা খুলে কখন যে প্রবেশ করল তা তারা বুঝতেই পারল না।সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রচন্ড হাসির শব্দ শুনতে পেল।তারা কি নিয়ে এত হাসছে তা বোঝার জন্য সে ধীর পায়ে এগিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল।রোহান শুনতে পেল ভেতর থেকে ভেসে আসছে কিছু কথা:
-“আরে রোহান শালা একটা ইমোশনাল ফুল! হাহাহাঃ ”
-“তবে হ্যাঁ, আজীবন কিন্তু এই বোকার হদ্দটাই আমাদের ডিঙিয়ে সামনে থেকেছে। ভাল রেজাল্ট করত।আবার আমাদের আগেই সে বুয়েটে চান্স পেয়ে গিয়েছিল,মনে আছে?”
-“এটা বল,যে আমরা চাকরি পেলাম না এখনো,আর সে পাশ করে বের হতে না হতেই সরকারি চাকরি….”
-” তোরাতো অাছিস পড়া আর চাকরি নিয়ে।কলেজের কোন মেয়েই যে আমাদের পাত্তা দিত না সেটা ভাব।সবাই চাইত রোহানকে। আর রোহান,সে আবার কোন মেয়েকেই পাত্তা দিত না। কী ট্রাজেডি! ”
-“এবার দেখ, ট্রাজেডি তুমি কার? হাহাহাঃ ”
-“দিয়েছি তার জীবনে প্যাঁচ লাগিয়ে।আর ঐ রিয়াকে তো আমি মোটেও চিনতাম না!তারপরো যা সুন্দর স্টোরিটা দিয়েছি না,ফাটাফাটি! হাহাহাঃ ”
-“হাহাহাঃ (রোহান হেসে উঠল)
-“আরে রোহান,তুই কখন এলি?আজ এত জলদি ফিরে এলি?”
-“ভাগ্যিস জলদি ফিরেছিলাম।নইলে তো তোদের সিনেমাটা মিস করতাম!”
বন্ধুরা বেশ বুঝতে পারছে রোহান সব বুঝে গেছে।এবার তাদের কপালে কি আছে কে জানে?
.
চলবে………

৪৭৩জন ৪৭৩জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ