পৃথিবীর পথে পথেঃ  ফ্রান্স,প্যারিস,  সাল ১৯৯৩ , ভ্রমণ কাহিনী 

“A walk about Paris will provide lessons in history, beauty and in the point of life” 

 

প্যারিস মানে মিউজিয়াম,আর্ট, কালচার, আর্কিটেক্ট,মিউজিক,আইফেল টাওয়ার আর  নদী স্যাইন (Seine)।

প্যারিসে তাই সবচেয়ে বেশি টুরিস্ট আসে এই কয়টি জিনিস দেখতে,জানতে আর বুঝতে ।  আমাদের পরিবার টিম এবার রওনা দিলাম প্যারিস আবিষ্কার করতে তবে প্লেনে নয় কোচে ।

লন্ডন থেকে প্যারিস ২৫৫ মাইল ,কোচে সময় লাগে ৯ ঘণ্টা । লন্ডনের হ্যামারস্মিথ কোচ স্টেশন থেকে কোচ নিলাম । বেস আরামদায়ক কোচ আধা শোয়া  হয়ে যাওয়া যায় । সন্ধ্যায় কোচে উঠে সকালের দিকে ডোভার ফেরি ঘাটে ফেরি নিলাম এবং ফ্রান্সের calais গিয়ে ফ্রান্সের মাটিতে পা দিলাম। এখান থেকে প্যারিস যেতে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে। মাঝে পড়ে ফ্রান্সর Bercy, Saint Deniss এবং তারপর  Levallois, এটায় আমাদের গন্তব্য স্থল ।

মিউজিয়াম 

প্যারিস কে বলা হয় মিউজিয়ামের শহর। ইতালির চেয়েও এখানে বেশি মিউজিয়াম আছে।

“Grand Paris Area” যেখানে অবস্থান ‘Louvre Pyramid’ এবং আস পাশের বেস কিছু মিউজিয়ামের অবস্থান। সেগুলো এক এক করে ভিজিট করলাম। Louvre Pyramid গ্লাস এবং মেটাল স্ত্রাকচার দিয়ে তৈরি এবং এটির আর্কিটেক্ট একজন চাইনিজ আমেরিকান যার নাম I.M.Pei

ফ্রান্সে মোট ১৩০ টি মিউজিয়াম আছে। বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়াম, হিস্ট্রি মিউজিয়াম, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আর  Speciality Museum মোটামুটি ভাবে দেখেনিলাম। কারন এত বিশাল একেক টা  যা ভালো করে দেখতে অনেক সময় দরকার। তার মধ্যে “মনালিসা” আর্ট মিউজিয়ামে এবং “নেফারতিতি আর এখেনেটেন ” হিস্ট্রি মিউজিয়ামে এই দুইটি আমাদের মনে দাগ কেটে থাকবে। আমাদের মতো অনেক টুরিস্টেই  এই দুইটি জিনিস দেখার জন্য ভিড় করে সবচেয়ে বেশি ।

ইন্টার ন্যাসান্যাল অরগানাইজেসান

টুরিস্ট বাসে উঠে আমরা দেখতে বের হয়েছিলাম কি কি এখানে আছে। নিচের অরগানাইজাসান গুলোর হেড অফিসের সামনে গেলে বাসের গাইড এই সব দেখালো ।

 প্যারিসে বেশ কিছু বিখ্যাত ইন্টারন্যাসানাল অরগানাইজেসান আছে যেমন ‘ইউনাইটেড ন্যাসান’, ‘ইউনিসেফ’, OECD, ইন্টার ন্যাসান্যাল এনার্জি এজেন্সি, ইন্টার ন্যাসান্যাল ফেডারেশন অব হিউম্যান রাইটস , ইউরোপ স্পেস এজেন্সি, ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্ক অথরিটি ইত্যাদি ইত্যাদি ।প্যারিস ঘুরতে ঘুরতে এই অরগানাইজেসান গুলো দেখলাম।

টুরিস্ট বাসের গাইড জানালো ১২ থ সেঞ্চুরিতে প্যারিস পলিটিক্যাল, ইকোনমিক,ধর্ম, আর কালচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলো ।

‘ফ্রান্স’ পশ্চিমা বিশ্বের একটা গুরুত্ব পুর্ন দেশ। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ফ্রান্সের কলোনি ছিল। আন্তর্ক জাতিক এফিয়ার্সে ফ্রান্সের একটি গুরুত্ব পুর্ন  এবং শক্তিশালী পজিসান  আছে।

ফ্রান্স সরকার জনগণের ভালো সেবক । এখানে ফ্রী ইডুকেসান, ফ্রী চিকিৎসা আর বেকার ভাতার সুবিধা আছে।

Arede Triomphe de I’ Etoile

এটি প্যারিসের একটি ফেমাস মনুমেন্ট । সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে মৃত সোলজার দের কবর এখানে আছে । টা ছাড়া যে সমস্ত সোলজারের মৃত্যু হয়েছে তাদের নাম এই মনুমেন্টে লেখা আছে।

আইফেল টাওয়ার ( Eiffel Tower) 

চোখের সামনে আইফেল টাওয়ার !

ভাবতেই পারছিনা। India বা ভারতের তাজমহল যেমন তেমন প্যারিসের আইফেল টাওয়ার ।আমরা উপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি নিলাম না ।কারন মোট ৬৭৪ টি ধাপ উঠা মোটেও সম্ভব নয়। লিফট দিয়ে উঠতে সময় লাগলো ১০ মিনিট। মোট তিনটি ফ্লোর আছে। সেখানে টয়লেট এবং চা খাওয়ার ব্যাবস্থাও আছে। প্যারিসের “Champ de Mars” এটির অবস্থান ।সব চেয়ে উপরের ফ্লোর থেকে সমস্ত প্যারিস দেখা যায় । প্রতি বছর ছয় মিলিয়ন ভিজিটর আসে এত দেখতে ।  ২২ মাস লেগেছে শেষ করতে । ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৯ পর্যন্ত সময় লাগে । পুরো টি লোহা দিয়ে তৈরি। আর্কিটেকচারের নাম “Gustave Eiffel” এবং তার নামেই এটির নাম আইফেল টাওয়ার । এই টাওয়ার এর  উদ্দেশ্য   “শক্তিশালী ফ্রান্স ” । এটি ফ্রান্সের সিম্বল ।মোট ওজন ১০,০০০ টন । আমরা উঠার সময় লিফট দিয়ে উঠলাম আর নামার সময় হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম , সেটা  ছিল একটা ভালো অভিজ্ঞতা ।

‘আইফেল টাওয়ার ‘  এর মানে “আমরা কতটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিনিয়াস” ।

 

কান্ট্রি সাইড বা ফ্রান্সের গ্রাম

প্যারিস দেখলাম মেট্রো করে,  টুরিস্ট বাসে  এবং হেঁটে হেঁটে । অট্টালিকার ডিজাইন ইউরোপিয়ান ডিজাইনে করা। তাই ব্রিটেনের মতোই লাগছিল। যাই হোক একটা দেশের রাজধানী শহর দেখতে দেখতে সেই দেশটিকে চেনা যায়না । চিনতে হলে কান্ট্রি সাইড যেতে হয়। তা ছাড়া অট্টালিকা ভিড়ভাট্টা খুব একটা ভালো লাগেনা। যা আমার ব্যাক্তিগত পছন্দ  । তাই মন আঁকুপাঁকু করছিল ফ্রান্সের গ্রাম দেখার জন্য।

তাই গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়লাম । একদিকে সমুদ্র,  একদিকে আল্পস  আর অনেক সমতল নিয়ে ফ্রান্স । আছে অনেক অনেক  পন্ডস, লেইক আর ক্যানেল । যেতে যেতে চোখে পড়লো দিগন্ত জোড়া ল্যাভেন্ডার ক্ষেত যা দেখে মনে হচ্ছে  পার্পল কালারের চাদর বিছানো আছে। আবার কোথাও হলুদ রঙের সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেত । হলুদ আর হলুদ। মৌমাছি উড়ছে চারদিকে। কোথাও সরষা বা রাইয়ের ক্ষেত । দিগন্ত জোড়া সোনালি রঙের পাকা গমের ক্ষেত।  কোথাও  ভুট্টা ক্ষেত। কাটার জন্য অপেক্ষা করছে। কোথাও শুধু ঘাস যেখানে শত শত গরু চরছে ।

দুধ উৎপাদনে আর তা  দিয়ে চিজ তৈরি করা ফ্রান্সের একটা বিরাট বিজিনেস। ২৫৫ রকমের চিজ এখানে বানানো হয়। ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্স একমাত্র দেশ যে  কিনা খ্যাদ্যে স্বয়ং সম্পুর্ন ।  এখানে প্রচুর পরিমাণে গম, বার্লি, ভুট্টা, আলু, সুগার বীট , ভেজিটেবল উৎপাদন হয়। আছে বিরাট বিরাট ডেইরি ফার্ম । তাছাড়া চিকেন এবং পর্ক বা শুকর ফার্ম আছে অনেক।

ফ্রান্সে ৩০,০০০ ভিলেজ আছে । যা কিনা শহরের মতো সব কিছু সুযোগ সুবিধা সহ । আছে পাকা রাস্তা,ইলেকট্রিসিটি , মোবাইল আর ওয়াইফাই নেট ওয়ার্ক আর পানির লাইন। বাড়িঘর সব স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে বানানো । আছে শিক্ষা হসপিটালের সুবিধা।

Gordes, La-Roque, Gageac, Riquewhr, Yvoire নামের এই পপুলার গ্রাম গুলোতে টুরিস্ট আসে ভিজিট করতে ।আমরা ও ভিজিট করলাম গ্রাম গুলো। যা এক কথায় চোখ জুড়ানো । ফ্রান্সের সামারের ওয়েদার ব্রিটেনের সামারের চেয়ে গরম তবে শীতকালে শীত কিছুটা বেশি। তবে দক্ষিণে মেডিটেরিয়ান ওয়েদার । না শীত না গরম । যা আরাম দায়ক।ছোটো ছোটো হিলি এরিয়া যা কিনা ঢাকা আঙ্গুর ক্ষেত দিয়ে ।সে  এক চমৎকার দৃশ্য ।  ফ্রান্স বিখ্যাত তার আঙ্গুর দিয়ে মদ আর ড্রিঙ্ক বা পানীয়র জন্য।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ Jules Michelet বলেন ‘ ব্রিটেন বিখ্যাত এম্পরারের জন্য, জার্মান বিখ্যাত তার ন্যাসান এর  জন্য আর ফ্রান্স বিখ্যাত অনেক গুণী মানুষের জন্য। আর তাঁরা হলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক Gustave flaubert, দার্শনিক Rene Descartes , Claude Monet,Marie Curie, Victor Hugo, Voltaire, Antoine de Saint-exupery, Albart camus, Louis Pasteur, এবং আরও অনেকে।

ফ্রান্স অভিযান শেষ করে লন্ডন ফিরে ভাবতে থাকলামঃ

“There is no man who is more complete than the one who travels a lot . He changed twenty times the way he think and his outlook on life”

লেখকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস, লন্ডন

 

১৬১জন ১৬১জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ