পুত্র ও কন্যার মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার সম্পত্তি সমান ভাবে বণ্টনের ক্ষেত্রে, মুসলিম বিশ্বের মিশরের বিখ্যাত আলেম ডঃ আজহারী শেখ আহমেদ কারিমা,প্রফেসার ইসলামীক ল,  তাঁর  বয়ান  যা মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় একটি ব্যাখ্যা এবং ভালো মতোই চর্চা হচ্ছে অনেক মুসলিম বিশ্বে  

 

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাবা বা মার সম্পত্তি পুত্র এবং কন্যার মধ্যে সমান ভাবে বণ্টন কি ভাবে করা যায় তা নিয়ে প্রসিদ্ধ ইসলামী আলেম গন একত্র হয়ে আলোচনা করে  যে  বক্তব্য রেখেছেন তা হল,যেহেতু এটি  একটি বিতর্ক মূলক বিষয় তাই কি ভাবে এর বিকল্প খোঁজা যায় যা দিয়ে তার বান্দা কষ্টে পড়বে না এবং কুরআন কেও অমান্য করা যাবেনা ।

কিন্তু তা চিন্তা ভাবনা করে সমান ভাবে বণ্টনের  জন্য  যথেষ্ট যুক্তিও আছে। যা আমাদের অনুসরণ করতে হবে । আর তা না করা হলে আল্লাহর বান্দাকে কষ্টে ফেলা হবে । যা আল্লাহ চান না ।

যেহেতু একটি উক্তি কুরআনে আছে “Forbidden from tempering with divine wisdom that guides laws of inheritance”. ‘এটা আমার ইচ্ছা এবং তার অমান্য তোমরা করবেনা’ ।

বিখ্যাত মিশরীয় ইসলাম ধর্মীও  আলেম করিমি বলেন ” কুরআনের বক্তব্য টি একজন মানুষের মৃত্যুর পরেই কার্যকরী হবে । কারন সেখানে বলা হয়েছে “একজনের মৃত্যুর পর”

তাই একজন তার সম্পদ জীবিত অবস্থায় পুত্র কন্যার মধ্যে সমান ভাবে লিখে বা বিক্রি করে দিতে পারে। তা হলে কোন অসুবিধা নাই । এবং কুরআন অমান্য করাও হবেনা।

আজহারী শেখ আহমেদ করিমি বলেন “যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌ পুত্রকে বেশি দিতে বলেছিলেন বাস্তবে তা হচ্ছেনা”।

আর তা হলো  পরিবারে একজন বোন,বৃদ্ধ বৃদ্ধা যখন অসহায় অবস্থায় পড়ে তাদের দায়িত্ব পুত্রদের হাতে পড়ে । পুত্র যেন এই অতিরিক্ত সম্পত্তি দিয়ে তাদের দায়িত্ব নায় ।

কিন্তু বাস্তবে ভাই  তার বোনের দায়িত্ব বা চাচা/ মামারা একটি কন্যা সন্তানের দায়িত্ব নায়না।

তাই একটি বোন তাদের ভাইকে বেশি সম্পদ দিয়ে নিজেরা কম নিয়ে কেন কষ্ট করবে?

ইসলাম ধর্মের এই নীতি ব্যাবহার করে  ভাই বা চাচা /মামা নিজেদের লোভ চরিতার্থ করে আসল উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে।

আল্লাহ্‌ চেয়েছেন অসহায় দের পাশে দাঁড়াতে ।

আজহারী শেখ আহমেদ করিমি বলেন “বাস্তবে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে  আল্লাহ্‌  pleased বা খুশি হবেন না”।তিনি বলেন “I dont think it does”

তিনি আরও বলেন “ইসলাম ধর্মের নীতি তখনি সঠিক ভাবে পালন করা হবে যখন অসহায় মা বোনদের পাশে ভাই বা চাচা/মামারা দাঁড়াবে” ।

একজন ভাই বা চাচা বা মামা নীতিবান না হলে কি ভাবে এদের দায়িত্ব নিবে ?

আজহারী ইসলামী আলেম শেখ আহমেদ করিমি বলেন “কুরআনের নির্দেশ শুধু মাত্র একজন মানুষের মৃত্যুর পর কার্যকরী হবে কিন্তু জীবিত থাকা অবস্থায় একজন তার সম্পত্তি তার ইচ্ছা মতো বণ্টন করে দিতে পারে”। এই ভাবে তিনি এই নীতি থেকে বের হওয়ার পথ বাতলে দিয়েছেন।

“His view is logical ,modern and realistic and does not negate divine commandments in anyway”.অর্থাৎ তাঁর যুক্তি আধুনিক, বাস্তব সম্মত এবং কুরআনকেও অন্যান্য করা নয় ।   সহমত প্রকাশ করেন অন্যান্য ইসলাম ধর্মের আলেম অলিমা গন।

দুঃসহ এবং অসহায় মেয়ে দের অবস্থায়  তৎকালীন এর‍্যাবিয়ান পেনিসুলায় ছিল  এবং তারেই পরিপ্রেক্ষিতে এই আইন করা হয়েছিল তাদেরকে রক্ষা করার জন্য।

শেখ করিমা এবং  তাঁর যুক্তি

সে সময় অপেক্ষাকৃত নাজুক অবস্থায় ছিল একজন মেয়ে ,মা, বোন এবং অনাথ মেয়ে শিশু । তাদের পাসে অর্থনৈতিক ভাবে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন ছিল চাচা বা মামা বা ভাই দের ।  কিন্তু এখন মেয়েরা নিজেরা উপার্জন করে নিজেকে বাঁচাতে পারে অর্থনৈতিক ভাবে। তাই অর্থনৈতিক ভাবে সাপোর্ট দেয়ার জন্য ভাই/চাচার দরকার হয় না । আর এই কারনে ভাই দের সম্পত্তি দ্বিগুণ নেয়ার কোন দরকার নাই ।

আর তারা যদি আল্লাহর আইন দেখিয়ে বোনদের দ্বিগুণ সম্পত্তি নিয়ে নায় তাতে কি আল্লাহ্‌ খুশি হবেন ?

একটা বোন সেও আল্লাহ্‌র বান্দা । সে তার পুত্র কন্যা নিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে টানা পোড়নের মধ্যে থাকবে আর তারই  ভাই, বোনের  দ্বিগুণ  সম্পত্তি নিয়ে ভালো ভাবে জীবন যাপন করবে, আল্লাহ্‌ কি তাই চেয়ে ছিলেন ?  নাকি ন্যায়পরায়ণ আল্লাহ্‌ এতে pleased হবেন ?

আল্লাহ্‌ নিরপেক্ষ। তিনি বান্দার ক্ষতি  চান না। তিনি অসহায় দের পাসে দাঁড়াতে বলেছেন। এতিম কে সাহায্য করতে বলেছেন । মা বোনের দায়িত্ব নিতে বলেছেন যদি তারা অসহায় হয়ে পড়ে। তা যখন হয়না তবে তা থেকে বের হয়ে আসার পথ বাতলে দিয়েছেন বিখ্যাত আলেম আজহারী শেখ কারিমা  তার পেছনের যুক্তি দিয়ে।

তাঁর কাছে মেয়েদের কাছ থেকে অনেক কমপ্লেন আসে ভাইদের দ্বিগুণ সম্পত্তি নিয়ে ,  তার ই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই বয়ান দেন।  অন্যান্য আলেম অলিমাদের সাথে আলাপ আলোচনার করে ।এখন মিশর সহ অনেক মুসলিম কান্ট্রি তে এই  ভাবে সম্পত্তি বণ্টন হচ্ছে।

যা বাংলাদেশও অনেক পরিবারে এর প্রাকটিস হচ্ছে। তবে আরও প্রচার দরকার, দরকার মানুষের সচেতনতা বাড়ানো । বিশেষ করে মেয়েরাকে জানতে  হবে কি ভাবে সমান সম্পত্তি নেয়া যায়। যা আল্লাহ্‌ বান্দা হিসেবে তার ন্যায্য অধিকার।  কারন মেয়েরাও আল্লাহ্‌র বান্দা শুধুমাত্র পুরুষেই আল্লাহ্‌ বান্দা নয়।

তাছাড়া মিশরে আইন দিয়ে কঠিন শাস্তির ব্যাবস্থা করা হয়েছে যদি কোন ভাই,  বোনদের সম্পত্তি থেকে  বঞ্চিত করে তবে সেই ভাইটির জন্য ।

তিউনেসিয়া এবং তুরস্ক এই দুইটি দেশে ইসলামী আইন থেকে বের হয়ে এসে “সম্পত্তির জেন্ডার ভিত্তিক সমান  বণ্টন”   সরকারি আইন মোতাবেক শুরু হয়েছে।

“December -4 ,2018 on November 25, 2018  the cabinet of Tunisia approved a bill that the first time in the nation’s history ,would require that male and female heirs receive equal inheritance shares”.

অর্থাৎ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের চার তারিখে এই বিল পাস হয় নারী ও  পুরুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ সমান ভাবে বণ্টন হবে।

তিউনেসিয়া প্রথম মুসলিম দেশ যেখানে এই ধরনের বিল প্রথম approve হয়।

তুরস্ক

“According to Turkish inheritance law, there is no differentiation between heirs based on gender male and female heirs are equal”.  সেখানে পার্লামেন্টে আইন পাস হয় সম্পত্তি সমান ভাবে ভাগা ভাগি হবে মেল এবং ফিমেইল জেন্ডার এর মধ্যে ।

তার পরে  আসে মিশরঃ Egyptian woman Huda Nasrallah fights Islamic inheritance 

হুদা নাসরাললাহ (Huda Nasrallah) একজন মিশরীয় হিউম্যান রাইটস লইয়ার (Human rights lawyer) যিনি আইনি যুদ্ধে নেমেছেন মিশরে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ভাই বোনের মধ্যে সমান ভাবে বণ্টনে আইনি লড়াইয়ে ।

তিনি বলেন আমার বাবা যে মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি  রেখে গেছেন  তা নয়।এবং আমার ভাইরাও এক মত ভাইবোন সমান ভাবে সম্পত্তি ভাগ হওয়া উচিৎ ।  আমি লড়ছি একজন ভাইয়ের সমান কেন একজন বোন পাবেনা । তিনি এটাকে  নিয়ে যেতে চান পার্লামেন্টে বিল পাস করানোর ব্যাপারে।

তিনি বলেন “I have the right to ask be treated equally as my brothers” . তিনি বলেন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সন্মানিত আলেম আল-আজহার শেখ কারিমা সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাই /বোন সমান ভাবে বণ্টনের পক্ষে বয়ান দিয়েছেন এবং কি ভাবে তা করা যায় তা বলে গেছেন।

কিন্তু হুদা নাসরুললাহ আরও একধাপ নিয়ে যেতে চান । তিনি পার্লামেন্টে এই বিলটি পাস করাতে চান । যেমন করেছে তিউনেসিয়া এবং তুরস্ক । তিনি শুধু মিশরে নয় সমস্ত মুসলিম বিশ্বে এটা  কার্জকরি করতে বদ্ধপরিকর  ।

তিনি বলেন “If I didn’t take it to court ,who would?”

তথ্য সূত্রঃ

আল- জাজিরা নিউজ( Aljazeera News,Islamic inheritance )

আল- আরাবিয়া নিউজ (Al- Arabiya News)

Dr Ahmed Mahmoud karima,Professor of Islamic Law , Zaman News

ইউকিপেডিয়া

 

লেখক ও  গবেষকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস ,নারী ও শিশু অধিকার কর্মী , লন্ডন UK

 

 

৪১১জন ২২৬জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ