পঞ্চকন্যার পাঁচালী

স্বপন দাস ২ ডিসেম্বর ২০১৪, মঙ্গলবার, ০১:৩৭:২৭অপরাহ্ন বিবিধ ১৩ মন্তব্য

হিন্দুপুরাণ গুলি ( ১৮ টি মহাপুরাণ ও ১৮ টি উপপুরাণ ) সহ বিভিন্ন বেদ-বেদান্ত জুড়ে অসংখ্য নারীচরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। এই কাহিনীগুলিতে নারীকে কখনো দেবীরুপে, কখনো শাসকরুপে, কখনো স্নেহময়ী জননীরুপে, কখনো জিঘাংসু কুটিলারুপে আবার কখনো বা ব্যাকুল প্রেমিকা হিসেবে রুপায়িত করা হয়েছে। যদিও শেষপর্যন্ত পুরুষের ভোগ্যবস্তু হিসেবেই তাদের দেখা গিয়েছে।
এই অজস্র নারীচরিত্রের মধ্য থেকে হিন্দু শাস্ত্রকারগণ তাদের মহত্ব ও বিশেষ গুনাবলীর জন্য বিশেষভাবে পূজনীয় বলে পাঁচজন নারীকে স্থান দিয়েছেন — এঁদেরই বলা হয় পঞ্চকন্যা বা পঞ্চবতী ।। এই পঞ্চকন্যা নির্ধারণেও বিভিন্নতা পাওয়া যায়। একেকজন একেক তালিকা দিয়েছেন। সীতা ও সাবিত্রীর নাম সব তালিকায় থাকলেও আসলে নাম এসেছে মোট ৯ টি। তারা হলেন ~~~
সীতা,সাবিত্রী, অহল্ল্যা, তারা,গান্ধারী, কুন্তী, দ্রৌপদী, অরুন্ধতী ও দেবযানী ।।

আমার ইচ্ছে পর্যায়ক্রমে এদের প্রত্যেককে নিয়ে লিখবো – যদি পাঠকগণ আগ্রহী হন।
আজ লিখবো ” তারা ” কে নিয়ে ~~~~

নক্ষত্ররাজ্যের দেবী তারা ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতী। তিনি ছিলেন দেবতাদের পুরোহিত বৃহস্পতির স্ত্রী। একদিন চন্দ্রদেব, যার আরেক নাম সোম তারার রুপ দেখে এতই অধীর ও বিমোহিত হলেন যে তক্ষুনি তাকে অপহরণ করে নিজ প্রাসাদে তুলে নিয়ে যান। এদিকে বৃহস্পতি তা জানার পর তারাকে ফেরত দিতে সোমদেবের কাছে অনেক অনুরোধ করেন। কিন্তু সোম তারাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন সকল দেবতারা একজোট হয়ে সোমের বিপক্ষে যুদ্ধ শুরু করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে প্রচুর হতাহতের পরেও তারা জয়লাভে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে বৃহস্পতি পুনরায় সোমের কাছে আকুতি জানান তারাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য।
ততদিনে সোমের কামক্ষুধা অনেকটাই নিবৃত্ত হওয়ায় তিনি অবশেষে ফিরিয়ে দেন তারাকে।
গৃহে আনার পর বৃহস্পতি জানতে পারেন যে তারা অন্তঃস্বত্বা। তিনি তখন তারার কাছে জানতে চান, গর্ভস্থ সন্তানের পিতা কে — তিনি না সোম ?
যেহেতু বৃহস্পতি স্বামী হয়েও তাকে বা তার সতীত্বকে রক্ষা করতে পারেননি তাই ক্ষুব্ধ তারা তার সন্তানের পিতৃপরিচয় জানাতে অস্বীকার করেন এবং জন্ম দেন অপুর্ব সৌন্দর্যময় এক দেবশিশুর।
সুন্দর পুত্র দেখার পর বৃহস্পতি ও সোম দুজনেই পিতৃত্ব দাবী করতে থাকেন । এ নিয়ে দুজনের মধ্যে আবার সংঘাতের সূচনা দেখে উপস্থিত হন ব্রক্ষ্মা। তিনি তারাকে আড়ালে ডেকে তার সন্তানের প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানতে চান।
তখন তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেন এই সন্তানের পিতা সোম। সোম সানন্দে গ্রহণ করেন পুত্রকে।
পুত্রের নাম রাখা হয়, ” বুধ “।।

১০৪২জন ১০৪২জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

  • কৃন্তনিকা

    দেখুন, আমি যতদূর জানি, যে তারাকে পুরানের “পঞ্চকন্যা”দের মধ্যে ধরা হয়(বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে নয়), তিনি “রামায়ণ” গ্রন্থের হনুমানদের রাজা বালির পত্নী। বালিকে তার ছোটো ভাই সুগ্রীব শ্রীরামের সহযোগিতায় ছলনার মাধ্যমে বধ করেন। তখন সতী তারা পতিশোকে রামকে অভিশাপ দিয়ে বলেন,
    “আমি যদি সতী হই ভারতও ভিতরে
    কান্দিবে চিরদিন সীতারও তরে”
    (আমার জানায় সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু কিছু লেখার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে লিখবেন- অনুরোধ রইল।)
    পঞ্চকন্যাদের প্রত্যেকেই আদর্শ ধার্মিক নারী মনে করা হয়।
    ” যদিও শেষপর্যন্ত পুরুষের ভোগ্যবস্তু হিসেবেই তাদের দেখা গিয়েছে।” লাইনটি মেনে নিতে পারলাম না।
    পৌরাণিক বিষয় নিয়ে লেখার উদ্যোগকে স্বাগতম 🙂

    • স্বপন দাস

      ধন্যবাদ। বালির স্ত্রী তারা ইনি নন। রামের বালি বধ ছিলো ভীষণ কাপুরুষোচিত। তবে এ ক্ষেত্রে একটা খোঁড়া যুক্তি দেয়া হয়েছে যে বালির আগে সুগ্রীব এর সাথে রামের সাক্ষাৎ ঘটে এবং সুগ্রীব রামকে কথা দেয় সীতা উদ্বারে সাহায্য করার — সীতা উদ্বারে অধৈর্য রাম কোন কিছু না ভেবেই সুগ্রীব এর দেয়া শর্তানুযায়ী বালিকে হত্যা করে তাকে রাজা বানায় — সম্মুখ সমরে বালিকে হারাতে পারবেনা জেনেই রাম কাপুরুষ এর মত লুকিয়ে থেকে বালিকে হত্যা করেন — এটাই শেষ নয় বালির স্ত্রী তারাকে গ্রহণ করার অনুমতিও দেন তাকে। তারাকে এর আগেও সুগ্রীব ভোগ করেছিলো মিথ্যা কথা বলে, যে বালি নিহত — পরে বালি ফিরে এসে আবার তারাকে গ্রহণ করেন সাথে সুগ্রীব এর বউকে ও । — এসব জেনেও দ্বিতীয় বারের মত স্বয়ং রাম সুগ্রীব কে অনুমতি কিভাবে দিলেন তারাকে ভোগ করার ? এসব কাহিনীর অন্ত্যে — আপনিইই বলুন, নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখা হয়েছিল কি না ?
      তারা ক্রোধান্বিত হয়ে রামকে অভিশাপ দেন — সীতা উদ্বার করতে পারলেও রাম তাকে নিজের করে পাবে না —- এ কারনেই সীতার পাতালপ্রবেশ ঘটে।

      • কৃন্তনিকা

        বালির স্ত্রী তারাই পঞ্চকন্যার অন্তর্ভুক্ত। উইকিপিডিয়া দেখতে পারেন, যদি উইকিপিডিয়াতে বিশ্বাস না হয় উইকিপিডিয়ার নিচের দিকে গ্রন্থসমূহের রেফারেন্স থাকে। বইগুলো চেক করে দেখেন। আর আপনার কথার রেফারেন্স কি?
        দেখুন, পুরানের গল্পগুলোতে প্রচুর রুপক(metaphor) থাকে, সাধারণ মানুষজন সেগুলো বোঝে না দেখেই অন্য অর্থ বের করে।
        পুরানের গল্পগুলোতে নারীকে মোটেও ভোগবস্তু হিসেবে দেখানো হয় নি। তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। আমাদের সমাজে নারীদের বর্তমান অবস্থা যে খুব ভাল সেটা কি বলতে পারবেন? আগে অবস্থা আর খারাপ ছিল। আর সমাজের প্রেক্ষাপটকেই নানাভাবে নানা রুপক দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে পুরাণে।
        “পঞ্চকন্যা” বলতে সেসব পৌরাণিক নারীদের বোঝানো হয় তারা সমাজের অবিচারের শিকার হয়েও ধর্ম থেকে বিচ্যুত হননি। প্রত্যেক পঞ্চকন্যার অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সেজন্য তাদের “ভোগবস্তু” বলতে পারেন না। এখনো অনেক নারী অন্যায়ের শিকার হয়, তারাও কি ভোগবস্তু?
        “দ্বিতীয় বারের মত স্বয়ং রাম সুগ্রীব কে অনুমতি কিভাবে দিলেন তারাকে ভোগ করার ?” কথাটিও সঠিক নয়। তারা বিধবা, আর সেই সময় বিধবা নারীদের অবস্থা সম্পর্কে হয়ত আপনি অবগত। তাই শ্রীরাম সুগ্রীবকে পরামর্শ(অনুমতি নয়) দেন তারাকে বিয়ে করার। (এটি ‘বিধবাবিবাহ’ এর একটি প্রেক্ষাপট)
        ত্রেতা যুগে ভগবান বিষ্ণু পৃথিবীতে আসেন মানুষ “শ্রীরাম” রুপে। মানুষ কখনই পারফেক্ট হয় না। শ্রীরাম পৃথিবীতে যখন আসেন, তখন তিনি দেবতা নন, মানুষ যদিও অলৌকিক ক্ষমতা তার আছে। তাই তার কাপুরুষোচিত কর্মটিও মানুষ হিসেবে তার একটি ইমপারফেকশন। এই ইম্পারফেকশন দ্বাপর যুগের “শ্রীকৃষ্ণে”র ও আছেন(এখন আবার উনার ওসব নিয়ে কপচাবেন না আশা করি)।
        “রামায়ণ” শুধু ধরমগ্রন্থ নয়, এটি একটি সাহিত্যকর্ম। যুগে যুগে নানাজন হাতে এটি পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে, যার জন্য “অরিজিনাল” কোনটি সেটা এখন আর বের করা সম্ভব নয়। প্রকৃত রামায়ণ “বিভীষণপুত্র তরণীসেনে”র উল্লেখ নেই, কিন্তু কৃত্তিবাসের রামায়নে আছে। তাই কোনকিছুকে ফিক্সড ধরে মন্তব্য করতে পারেন না।
        “রামায়ণ” ও “মহাভারত” পৃথিবীর পাঁচটি মহাকাব্যের মধ্যে স্থান পেয়েছে নিজগুণে। ২টি গ্রন্থই ট্রাজেডিপূর্ণ, আর যে কোন ট্রাজেডির জন্য নায়কের ভুল থাকা আবশ্যক। সেজন্য রামায়ণে শ্রীরামের বালিবধ ও তারা কর্তৃক প্রাপ্ত অভিশাপ(আপনি যে কোন ট্রাজেডির গল্পে এমন পাবেন)।
        জানি না, আমি জা বুঝাতে চেয়েছি, আপনি বুঝছেন কিনা।
        আপনার যা খুশি লিখুন। কিন্তু ধর্মীয় ইস্যুতে অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই রেফারেন্স দিন।
        ভাল থাকবেন 🙂

  • মরুভূমির জলদস্যু

    -{@ এই অজস্র নারীচরিত্রের মধ্য থেকে হিন্দু শাস্ত্রকারগণ তাদের মহত্ব ও বিশেষ গুনাবলীর জন্য বিশেষভাবে পূজনীয় বলে পাঁচজন নারীকে স্থান দিয়েছেন — এঁদেরই বলা হয় পঞ্চকন্যা বা পঞ্চবতী ।। এই পঞ্চকন্যা নির্ধারণেও বিভিন্নতা পাওয়া যায়। একেকজন একেক তালিকা দিয়েছেন। সীতা ও সাবিত্রীর নাম সব তালিকায় থাকলেও আসলে নাম এসেছে মোট ৯ টি। তারা হলেন ~~~
    সীতা,সাবিত্রী, অহল্ল্যা, তারা,গান্ধারী, কুন্তী, দ্রৌপদী, অরুন্ধতী ও দেবযানী ।। -{@ -{@
    এই তথ্য টুকু অজানা ছিলো।

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ