মেয়াদোত্তীর্ণ গুড়ো দুধ ও বিষাক্ত পাম স্টেরিন মেশানোর দায়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)
চারটি তথাকথিত কনডেন্সড মিল্কের কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে। লাইসেন্স অনুযায়ী, কনডেন্সড মিল্কে কমপক্ষে ৮ ভাগ মিল্কফ্যাট থাকতে হবে যা গরু বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি হতে হবে। কোম্পানিগুলো এই শর্ত অমান্য করে ভেজাল কনডেন্সড মিল্ক তৈরি করার কথা স্বীকারও করে।

এরপর কোম্পানিগুলো ভেজিটেবল ফ্যাট দিয়ে কনডেন্সড মিল্ক তৈরির অনুমতি চেয়ে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরির দাবি তোলে। যাতে করে তারা কনডেন্স মিল্ক উৎপাদন করতে পারে। তারা জানায়, এ ধরনের উপাদান দিয়ে মালয়েশিয়ায় কনডেন্সড মিল্ক উৎপাদন করা হয়।

স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তাদের এ দাবি বিএসটিআই নাকচ করে দেওয়ায় কোম্পানিগুলো আদালতের একটি রিট পিটিশন করে। যা এখনও অমিমাংসিত রয়েছে।

এ অবস্থায় কোম্পানিগুলো সয়াবিন ও পাম ফ্যাট ব্যবহার করে কনডেন্সড মিল্ক তৈরি অব্যহত রেখেছে।

গণস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কনডেন্সড মিল্কে ভেজাল প্রতিরোধ কমিটির সদস্য কবির আহমেদ বলেন, ‘আমরা কুমিল্লায় একটি কনডেন্সড মিল্কের কারখানা পরিদর্শন করেছিলাম। কারখানাটি উন্নতমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত ছিল। কিন্তু আমরা সেখানে বস্তা বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ গুড়ো দুধ দেখতে পাই। যেগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

সেগুলোকে গুড়ো করে ক্ষতিকারক বিষাক্ত পাম স্ট্যারিন মেশানো হয়। এরপর চিনি মিশ্রিত করে কনডেন্সড মিল্ক তৈরি করা হচ্ছিল।’
প্রসঙ্গত, বিএসটিআই ২০০২ সালে ওই তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তিনি আরও বলেন, ‘পাম স্টেরিন হজম না হওয়ার কারণে এটি মানবদেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। এটি সাধারণত কাপড় পরিষ্কারের ডিটারজেন্ট তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।’
বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ এই কনডেন্সড মিল্ক বিশেষত চা তৈরি করতে দোকান ও রেস্তোরায় ব্যবহার করছে। ফলে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই দেহের এই বিষাক্ত দুধ প্রবেশ করছে প্রতিনিয়ত।

কোম্পানিগুলো কনডেন্সড মিল্ক বিক্রির পরিমাণ সম্পর্কে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এটির ব্যবহার এতটাই বেশি যে গরুর দুধ দিয়ে চা তৈরির প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি তুলে দিয়েছে।

কালু নামে একজন চা দোকানদার বলেন, ‘আমি প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ কৌটা কনডেন্সড মিল্ক ব্যবহার করি।’ একই কথা বললেন খুলনার বটিয়াঘাটার চা দোকানদার ছবি বেগম।

দেশের ৬৮ হাজার গ্রামের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমপক্ষে পাঁচটি চা দোকান রয়েছে। এ থেকে সাধারণভাবে অনুমান করে বলা যায়, প্রতিদিন এসব গ্রামে কমপক্ষে তিন লাখ ৪০ হাজার কৌটা কনডেন্সড মিল্ক বিক্রয় হয়। আর মাসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে এক কোটি।

২০০৩ সালে করা অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী এমকে আনোয়ারের নেতৃত্বে বিএসটিআই চারটি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে।

ওই কোম্পানিগুলো হচ্ছে, ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক বাংলাদেশ লিমিটেড, আবুল খায়ের কনডেন্সড মিল্ক কোম্পানি লিমিটেড, এসএ কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড ও মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড।

২০০৭ সালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাম ও সয়াবিন ফ্যাট কনডেন্সড মিল্কে ব্যবহারের বৈধতা দিয়ে নতুন মান নির্ধারণ করতে বিএসটিআইকে আদেশ দেয়। এরপর থেকে কমপক্ষে ছয়টি কোম্পানি তথাকথিত এসব কনডেন্সড মিল্ক তৈরি করছে। নতুন এই লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী এসব কৌটা কনডেন্সড মিল্কের দাবি করতে পারবে না। এতে অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে মিষ্টি বা অমিষ্টি ‘কনডেন্সড ফিলড মিল্ক’ যাতে ২২ ভাগ গুড়ো দুধ রয়েছে। কিন্তু এই কোম্পানিগুলো বড় বড় লাল অক্ষরে ‘মিষ্টি কনডেন্সড মিল্ক’ ও ছোট কালো অক্ষরে ‘ফিলড’ বা মিশ্রিত লিখেই বিপণন করছে তাদের পণ্য।

এখনও পর্যন্ত বিএসটিআই অথবা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মত অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা করে দেখেনি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আদেও খাদ্যযোগ্য উপাদান ব্যবহার করে তাদের পণ্য তৈরি করছে কিনা।

বিএসটিআই’র উপপরিচালক (প্রশাসন) তাহের জামিল বলেন, ‘রিট পিটিশনটির বিষয়টি এখনও ফয়সালা হয়নি। কিন্তু কোম্পানিগুলো ভেজিটেবল ফ্যাট ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া নতুন লাইসেন্সের অধীনেই তাদের পণ্য বিপণন করছে।

আমরা শুধু মিষ্টি মিশ্রিত কনডেন্সড ফিলড মিল্কের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছি। ভেজাল মেশানোর জন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।’

বিএসটিআই এর নিয়ম অনুযায়ী, কনডেন্সড মিল্কসহ ১৫৫টি পণ্য বিপণনের জন্য লাইসেন্স প্রয়োজন হয়।
তাহের বলেন, ‘আমরা প্রায় তিন হাজার ৮০০ পণ্যের জন্য মান নির্ধারণ করেছি। ১৫৫টি পণ্য উৎপাদনের জন্য আমরা তাদের লাইসেন্স বাতিল করে জেলে পাঠাতে পারি। বাকি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ যেমন পুলিশ, স্থানীয় সরকার, জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা অধিকার বিভাগ পিওর ফুড অ্যাক্ট ২০১৩ এর মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

‘এটা নিশ্চিত করে বলা যায় অলাভজনক হওয়ায় কোনও কোম্পানি আর কনডেন্সড মিল্ক উৎপাদন করবে না।’
বিএসটিআইয়ের পরিচালক (রসায়ন) আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এই কোম্পানিগুলো খুবই ক্ষমতাধর ও তাদের শাস্তি দেওয়া বেশ কঠিন।’
ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার কাজী হাসান বলেন, ‘এক কেজি গুড়ো দুধের দাম ৬৫০ টাকা। আমরা কীভাবে ব্যবসা চালাচ্ছি তা সহজেই বোঝা যায়। এক কৌটা কনডেন্সড মিল্কের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা।’

তিনি জানান, তার কোম্পানি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক থেকে গুড়ো দুধ আমদানি করে।
বিএসটিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ৪০০ গ্রামের একটি কনডেন্সড মিল্কের কৌটায় ৮৮ গ্রাম গুড়ো দুধ অব্যশই ব্যবহার করতে হবে। যার মানে দাঁড়ায় এক কৌটায় ৫৭ টাকা খরচ হবে শুধু গুড়ো দুধের পেছনে। কিন্তু ৩৯৭ গ্রামের একটি কনডেন্সড মিল্কের কৌটার পাইকারি মূল্য ৫৮ টাকা।

একটি ৪০০ গ্রামের কনডেন্সড মিল্কের কৌটা কি করে মাত্র ৫৮ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে- এ প্রশ্নের জবাবে সামাননাজ (গোয়ালিনী) কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেডের একজন প্রতিনিধি বলেন, “এটা আমাদের ব্যবসায়িক গোপনীয়তার স্বার্থে প্রকাশ করা যাবে না। আর আপনারা এ সব প্রক্রিয়া বুঝতেও পারবেন না।”
তবে বিএসটিআই এসব কোম্পানিকে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। ২০০৭ সালের সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, ২২ শতাংশ গুড়ো দুধের পরিবর্তে ৩৯৭ গ্রামের এক কৌটা কনডেন্সড মিল্কে ২০ শতাংশ গুড়ো দুধ দেওয়ার অনুমতি দেয়।

তাহের জামিল বলেন, ‘বিএসটিআই এর উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে ও তাদের শাস্তি প্রদানের এখতিয়ার দেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে কনডেন্সড মিল্ক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে-পারটেক্স গ্রুপের ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক, তাসনিম কনডেন্সড মিল্ক (নাম্বার ওয়ান), মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড ইন কুমিল্লা (ফ্রেশ), সামাননাজ কনডেন্সড মিল্ক (গোয়ালিনী), সানোয়ারা কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড (ডিপ্লোমা) এবং আবুল খায়ের কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড (স্টারশিপ) ।

লেখাঃ Salim Mahmud 

লেখাটি ফেইসবুকের  Shahidur Rahman   এর ওয়াল থেকে নেয়া, তারিখ ৩ জুলাই, ২০১৮

২৩৭৮জন ২৩৭৪জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ