সময় হিসেব কষে সকল কর্মের...
সময় হিসেব কষে সকল কর্মের…

কিছু কিছু সময় আসে জীবনে যাকে গ্রহণ করে রাখতে কষ্ট আবার হারাতেও কষ্ট। হয়তো সকলের মনে হতে পারে, এ কেমন সময়? উত্তরটা আমি বের করেছি অপেক্ষা এবং তারপর এসে চলে যাওয়া। প্রতিটি সময়ই আসলে আমাদেরকে শেখায়। সময়ের প্রয়োজনে সবকিছুই হয়। কেউ এ কথা মানে, আবার কেউ না। আমি খুব মানি কথাটা। যেমন আরেকটা ব্যাপারে প্রচন্ড বিশ্বাস আমার স্বর্গ-নরক বলে কিছু নেই। যা কিছু সব এখানেই, এই মাটিতেই। আমরা কর্মের ফল যেভাবেই হোক এখানেই পেয়ে যাই, হয়তো কিছু কিছু ফলাফল বুঝতেও পারিনা। তা নইলে রাজাকারদের ফাঁসী হতোনা। একসময় জমিদার-নবাবদের কি দোর্দন্ড প্রতাপ, কোথায় আজ তারা? হাজার হাজার বছর আগে নারী রাজত্ত্ব ছিলো, কিন্তু আজ পুরুষরা রাজত্ত্ব করছে। ঘুরে-ফিরে সবই আসবে। ওই যে কথায় আছেনা, “লঙ্কায় যে যায়, সেই হয় রাবণ!” এও বলে,

“অতি বাড় বেড়োনা, ঝড়ে ভেঙ্গে যাবে
অতি ছোট হয়োনা, ছাগলে মুড়ে খাবে।”—–

কিন্তু আমরা যখন আমাদের প্রতাপ দেখাই, তখন কি ভাবি একদিন এমন দিন থাকবে না? আজ রাজা-উজির নেই, কারণ তাদের অতিরিক্ত উচ্ছৃঙ্খলতা। আজ নারী রাজত্ত্ব নেই, একদিন তারাও এমনই অহঙ্কার দেখিয়েছিলো। আজকাল পুরুষরা যেমন দেখায়। কিন্তু একদিন আবার আসবে নারী রাজত্ত্ব। কালের বিবর্তনে সবই চলে যায়, কিন্তু অনেক কিছুই ফিরে ফিরে আসে। এটাই জগতের নিয়ম। যে সন্তান বাবা-মা ছাড়া এক পা’ও চলতে পারতো না, সেই সন্তান বড়ো হয়ে যখন বাবা কিংবা মা হয়, তখন তাদের কাছে সন্তানই মুখ্য হয়ে ওঠে। তার কারণ তো সকলেই জানি আমরা। স্নেহ সবসময় নিম্নগামী, এভাবেই চলে এসেছে। তা নইলে একটা মেয়ে যখন সবকিছু ছেড়ে স্বামীর সাথে চলে যায়, তার শূণ্যতাকে পূর্ণতা দিতে আসে সন্তান। একজন নারী ঘরকে বাঁধে তার আদরে-যত্নে। বাবা-মায়ের প্রতি টান থাকলেও সে কিছুতেই ছেড়ে যেতে পারেনা তার সংসারকে।

আজ সত্যিই আমি এলোমেলো। পূজো চলছে খুব মনে পড়ছে বাপি-মামনিকে। আটটি বছর আগে একসাথে পূজা কাটিয়েছি, তারপর আর কবে যাওয়া হবে পূজোতে আমি জানিনা। তবে এটুকু বিশ্বাস একদিন আসবে যেদিন আমরা সবাই একসাথে পূজোতে আনন্দ করবো। যদিও মানুষ দুজন এবারও পূজো দেখতে পারবে না। বাপি সেভাবে হাঁটতে পারেনা। আর মামনি বাপিকে রেখে কিভাবে যাবে? যে মানুষ দুজন পূজোর দিনগুলোতে হবিগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জ সব জায়গায় গাড়ী নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, আমরা চারজন মানুষ। নিজেদের গাড়ী থাকা সত্ত্বেও বড়ো গাড়ী ভাড়া করতো শুধু যাতে বাসায় কাজ করে মানুষরাও যেনো প্রতিমা দর্শন করতে পারে, সেজন্য। শুধু কি তাই? মামনির ধর্মের ভাই সিকদার আঙ্কেল তো নিত্যসঙ্গী ছিলো। নিজের বাবা-মা বলে বলছি না, সবাই বলে এমন নিরহঙ্কারী-পরোপকারী মানুষ খুব কমই আছে। মানুষের বিপদে-আপদে ছুটে যাওয়া। মধ্যবিত্তের সংসার কিন্তু তারপরেও আর্থিকভাবে সাহায্য করতে দেখেছি তাদেরকে। যে পজিশনে চাকরী করে মানুষজন তিন-চারতলা বাড়ী করে ফেলেছে, সেই একই পজিশনে থেকে বাপির শুধু একটা গ্রামের বাড়ী ছাড়া কিছুই নেই। আর সেটাও আমার দাদুর থেকে পাওয়া। এমন কিছু মানুষ আজ তাদের আশেপাশে আছে, বাপি-মামনির কাছে আজ তাদের সেই স্বার্থ নেই, তাই আসেনা। এসব ভাবনা এলে মনে হয় ধুরো কেন কাউকে সাহায্য করবো? কিন্তু ওই যে রক্ত এই শরীরে, কিছুতেই পারিনা সরিয়ে নিতে। তবে আমি সবাইকে বলবো উপকার করুন, কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে। কথাতেই আছে, “আপনি বাঁচলে বাপের নাম।” যদিও যারা উপকার করে, ওই কথাটা উপকার করার সময় মাথায় থাকেনা। যেমন এই যে বলছি, আমি নিজেই তো সেটা ভুলে যাই।

আট বছর আগে একসাথে মৌলভীবাজার থেকে সুনামগঞ্জ পূজা দেখতে যাবার পথে...
আট বছর আগে একসাথে মৌলভীবাজার থেকে সুনামগঞ্জ পূজা দেখতে যাবার পথে…

নাহ থাক ওসব কথা। মন খারাপ করিয়ে দিলাম তো? তাহলে একটু অন্য কথায় যাই? গতবছর আমরা বন্ধুরা রবিবার রাতে বেশ আড্ডা দিচ্ছিলাম। কারণ আমার সাপ্তাহিক ছুটি হলো সোমবার। বেশ হৈ-চৈ মজা, আনন্দ। সারা সপ্তাহ কাজ করে এসে ছুটির রাতের আমেজ সে তো সকলেই জানেন। আড্ডা চলছে, ওরই মধ্যে খাওয়া শেষ হলো। ফ্রীজে সব গুছিয়ে রাখছি। আমার হাত থেকে একটা বাটি পড়ে ভেঙ্গে তো গেলোই, ওটার মধ্যে অনেক সাধের লাল শাক ছিলো। ফ্লোর লালে লাল, এমনকি দেয়ালেও দাগ লেগে গেছে। এখানে শুক্র-শনি রাতে কেউ যদি ফাঁটিয়েও মিউজিক শোনে, কেউ কিছুই বলবে না। আর আমাদের বাংলা ভাষার আড্ডা কি মিনমিন করে হয় নাকি? প্রতিবেশী তো দিলো পুলিশে কল। যাক কোনোভাবে আমি আর বন্ধু ঊর্মী পরিষ্কার করছি, ওই সময়েই দরোজায় নক নক। এতো রাতে কে? দরোজার peephole দিয়ে দেখি দুজন পুলিশ দাঁড়ানো। খুলে দিতেই ঘরে এসে ঢুকলো। ওহ এ আমাদের দুজনেরই জামায় লালশাকের ঝোল লেগেছিলো। তীর্থ ছিলো ওর রুমে। ওরা তো বাচ্চাদেরকে বিশ্বাস করে। ছেলেকে ডেকে জানতে চাইলো। তীর্থ তখন বললো, “They were not fighting they were just talking.” পুলিশটা এবার জানতে চাইলো লাল ওই দাগের কথা। তীর্থ এবারে বললো, “This is not blood it’s just red spinach.” আমাদের সব বন্ধুদের দিকে চাইলো, তারপর হেসে বললো, “Today is not weekend. So please don’t talk loud.”  পুলিশ দুজন যে কি হ্যান্ডসাম, কি আর বলবো! তীর্থকে বললাম হ্যান্ডসাম ওই পুলিশকে বয়ফ্রেন্ড বানাবো। প্রথমে বলে, “পাপা আছে।” বললাম তাতে কি! এরপরে বলে চিৎকার দিয়ে “নাআআআআআআ!” সাথে সাথেই বলে “মাম আমার ফান কেমন লাগলো?” বললাম মানে? তীর্থ বললো, “তোমার মতো আমিও ফান করেছি, চিৎকার দিয়ে।” ছেলেটা এমনিতে কি যে শান্ত। কিন্তু এমন কিছু দুষ্টুমী করে আমার খুব ভালো লাগে। এসব দুষ্টুমী হারিয়ে যেনো কখনোই না যায়, আমি সবসময় ঈশ্বরকে বলি।

শান্ত ছেলের দুষ্টু দুষ্টু হাসি...
শান্ত ছেলের দুষ্টু দুষ্টু হাসি…

ওহ এবারে একটু অশরীরি আত্মাদের কথা হোক।  আপুর ভূতের পোষ্ট দেখে মনে পড়লো আমার বাসাতেও তো একটা ভূত ছিলো। খুব ভয় পেতাম একসময় একা ঘরে থাকতে, একা একা ঘুমাতে। এসব অবশ্য সেই ছাত্রজীবনের সময়ের কথা বলছি। হলে আমি একা বিছানাতে ঘুমাতামই না। কি যে অবস্থা! আর এখন আমি একা ঘরে এমনকি একা বিছানাতেও শুয়ে দিব্যি ভালোভাবে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি। তখন এই বাসায় নতূন এসেছি। প্রায় ছয় মাস হবে। তো আমি স্নান সেরে এসে দুপুরে পূজোর আসনে ধূপকাঠি আর মোমবাতি জ্বালাচ্ছি। হঠাৎ মনে হলো পেছনে কোনো একটা বাচ্চা দৌঁড়ে গেলো। আমি ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি স্কুল তো ছুটি হয়নি, তীর্থ আগেই চলে এলো কেন? উঠেই ওর রুমে এসে দেখি ঘর ফাঁকা। ভাবলাম আমার মনের ভুল। যাক তারপর বেশ কয়েকদিন পর, একদিন রাতে ঊর্মীকে ফোন দিলাম, বললাম আয় খেয়ে যা। সব ফ্রেশ রান্না। তাও তোর পছন্দের। বললো কাজ শেষ হতে তো রাত দশটা বেজে যাবে। বললাম খেয়েই নয় চলে যাস। তখন অবশ্য আমার চাকরী ছিলোনা। যাক ঊর্মী এলো, তাও রাত প্রায় পৌনে এগারোটা। বললো ফ্রেশ হবে। ফ্রেশ হয়ে আসতেই খাবার খেতে বসলাম। তখন ও বললো, “জানিস তীর্থ কিন্তু ঘুমোয়নি। মটকা মেরে পড়ে আছে।” আমি বললাম অসম্ভব! তীর্থ দশটার সময় ঘুমিয়ে যায়, সারারাতেও আর ওঠেনা। ঊর্মী তখন বললো, “আমি নিজে দেখেছি তীর্থকে দৌঁড়ে যেতে! মিথ্যে বলিনা আমি, তুই জানিস।” উঠে তীর্থর বিছানার কাছে গেলাম ঊর্মীকেই নিয়ে। বোঝাই যাচ্ছিলো অনেকক্ষণ আগেই ও ঘুমিয়ে গেছে। ঊর্মী তো ভয়ে শেষ! বললো, “তাহলে কাকে দেখলাম! বিশ্বাস কর নীলা একেবারে তীর্থর মতো উচ্চতা।” তারপর আমি সব বললাম। ও তো কি ভয়! তারপরেও আছি ইত্যাদি ইত্যাদি। হুম সেই একই বাসায় আছি এখনও। আমি ওই বাচ্চাটিকে আর দেখিনি। আত্মায় বিশ্বাস করি। যদি থাকেও আমার তো কোনো ক্ষতি করছেনা। অবশ্য এও ঠিক আমি আর তাকে দেখতেও চাইনা। একটা প্রবাদ দিয়ে আজকের মতো ইতি টানছি, “বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহুদূর।”

গাছ নাকি ভূতের হাত-পা?
গাছ নাকি ভূতের হাত-পা?

 

**শুভ শারদীয়া দূর্গোৎসবের শুভেচ্ছা আবারও…আজ দেশে অষ্টমী পূজো। সবাই আনন্দে থাকুক, স্বস্তিতে থাকুক।**  -{@

শিউলি নয়, Tepal…একরকম ঘাসফুল…পূজোতে ফুলেল শুভেচ্ছা…

হ্যামিল্টন, কানাডা
৮ অক্টোবর, ২০১৬ ইং।

এলোমেলো কিছু কথা…**সতেরো**

৭৫৩জন ৭৫৫জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ