12 [640x480]
বাবা,
তুমি কি শুনতে পাও প্রতিরাতে আমার নিরব কান্না? বাবা তুমি কি জান, তোমার রাজ্যে রাণী করে রাখা মেয়েটি আজ কতো কাজ করে? কতো রাত সে না খেয়ে ঘুমিয়েছে? যে তুমি তোমার মেয়ে না খেলে এটা ওটার লোভ দেখিয়ে খাওয়াতে, মায়ের উপর মিথ্যা অভিমানে, আমাকে খুশি করতে মাকেই বকা দিতে। আমি হেসে ফেলতাম, পরে মাকে জড়িয়ে ধরতাম, মায়ের মান ভাঙ্গাতে। যে তুমি আমার কাজ করা দেখলে খুব রাগ করতে, বলতে হাত নষ্ট হবে, মসৃণতা কমে যাবে। সেই আমি কতো কাজ করি জানো? সকালে সবাই উঠার আগে ঘর ঝাড়ু, উঠান ঝাড়ু, চুলা লেপা, কাপড় ধোয়া, সবার নাস্তা তৈরী করা। কতো কাজ! অবশ্য গোসলটা সেই কাক ডাকা ভোরেই করতে হয়। শাশুড়ির আদেশ, বাসি শরীরে নাকি চুলা ধরতে নেই। তা সে কনকনে ঠান্ডাই কেন না হোক। আচ্ছা আব্বা, শরীর কেমন করে বাসী হয়?

তুমি অফিস থেকে এসে আগে বলতে আমার মেয়েরা খেয়েছে তো! আমরা চার বোন, তুমি বলতে তোমার চোখের মনি। ছোটটা হওয়ার পর মায়ের একটু রাগ হইছিলো, আক্ষেপ আবারো মেয়ে! তুমি বলতে আমাদের তোমার লক্ষী। মায়ের কষ্ট তুমি কতো কমিয়েছ, কাজে সাহায্য, তার সহকারি রেখে দেওয়া। মা যখন বলত,”আমিই সব পারব, তুমি বলতে, দরকার নেই। যখন আমি বাইরে থাকবো,  তুমি আমার মেয়েদের দিয়ে কাজ করাবে। দোকান থেকে যা ইচ্ছা এটা এনেছি, ওটা এনেছি। কিছু বলোনি। শুধু বলতে “মা আমার সাধ্যমত আনিস “।  বাবা তোমার মতো সবাই কেন হতে পারে না?

মায়ের এক অজানা ভয়ে তুমি চেয়ারম্যান বাড়ি, শিক্ষিত পরিবারে আমায় সেই অল্প বয়সে বিয়ে দিলে। যতোই তারা শিক্ষিত হোক তবুও আমি কৃষাণীই কিন্তু বাবা।

আমার সামান্য মাথা ব্যথায় রুমে একা থাকলে বাড়িতে যতো মেহমানই আসুক সবাইকে বলতে , আমায় যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে। সেই তোমার মেয়ে কতো কাজ করে জ্বর নিয়ে তুমি জান? তুমি জান বাবা, এটাই নিয়ম, বাড়ির বউদের নাকি বলতে নেই সব সময়-শরীর খারাপ লাগছে। শরীরের নাম নাকি মহাশয়, যা সহাবে তাই সইবে। যদি এটাই নিয়ম হবে তবে ছোট বেলা থেকে কেন শেখাও না কাজ করা? কেন শেখাওনা না ও বলতে হয়।

তারা তোমায় বলেছিল,”ভাইসাব আপনার মেয়ে রাণীর মতো থাকবে। আমার বাড়ির মেয়েদের সাথে পড়বে”। পড়েছি বাবা, কী করে ধান সেদ্ধ করতে হয়, কী করে রস দিয়ে গুড় করতে হয়, কী করে সবাইকে সামান্য তরকারি ভাগ করে দিতে হয়, কী করে দুধ দোয়াতে হয়, কী করে বুঝতে হয় কখন গরুটাকে খাবার দিতে হবে।

তোমার জামাই সে খুব ভালো মানুষ। বউ বললেই নাকি স্বামীরা বড় হয় সবার কাছে। আমার থেকে বয়সে বড় ননদদের নাকি আমার সব জিনিসের প্রতি হক আছে। শাশুড়ির আদেশ, তার মেয়েরা যেন কষ্ট না পায়। বিয়ের প্রথম প্রথম তোমার জামাই বলতো সবার সাথে খেয়ে নাও। হয়ত তার তখন মায়া হতো, হয়ত ভাবতো বিছানায় আলাদা যত্ন পাব। আচ্ছা ক্লান্ত শরীরে সব অনুভূতি কাজ করে?

তোমার জামাই এর কথায় আহ্লাদে আমি গদ গদ হতাম, শাশুড়ির কথা ভুলে গিয়ে খেতে বসতাম। খাওয়া অবস্থায় ও একেকজনের একেক আবদার। খাওয়া শেষে শাশুড়ি বলতো কেমন বৌ তুমি? খেতে বসে গেলে বেহায়ার মতো। রান্নাঘর ঠিক করেই না বসবে!

দুপুরে যখন ক্লান্তিতে তোমার নাতনিকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে একটু চোখ লেগে আসতো, ননদ এসে বলতো ” বাথরুমটা একটু পরিষ্কার করে দাও,আমি গোসল করব”। কেন করে দিব না বলো, সে কলেজে পড়ে,বাড়ির সবার ছোট। এটা তো ভাবীর কাছে আবদার করতেই পারে! এত কিছুর পরেও, তোমার জামাইকে আমি প্রেমে ভাসাতে পারিনি। সে চলে গেছে অন্যপথে।

জানো বাবা, এখন কোনো অনুভূতি নেই। ভোতা হয়ে গিয়েছে।

শোন বাবা আমার এই চিঠি পেয়ে কাঁদবে না কিন্তু তুমি। অবশ্য তুমি যেখানে আছ, আমি তো দেখবই  তোমার কান্না। তোমার মেয়ে ভালো আছে অনেক ভালো।

বাবা, এই চিঠি সাগরে, নদীতে না ঐ দিগন্তে কোথায় দিলে পাবে তুমি?
পাবে তো!

১৯০৮জন ১৯০৮জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ