এই শহরে যে যেমন

রিমি রুম্মান ২৩ মার্চ ২০১৬, বুধবার, ১০:৪৩:৪৫পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২২ মন্তব্য

এ এলাকায় আমার বসবাস ষোল বছর। আশেপাশে বাঙালি পরিবার নেই। ছেলেকে নিয়ে মসজিদে যাবার পথে দু’ব্লক দূরে একজন হিজাব পরিহিতা নারীকে দেখি গত বসন্তে। বাড়ির সামনে বাগান পরিচর্যা করেন মাঝে মাঝে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে ফায়ার হাইড্রেন্ট এর ঢাকনা খুলে সেখান থেকে প্রবল বেগে নির্গত পানি নিয়ে খেলা করছিল, একে অপরকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো কিছু স্প্যানিশ ছেলে মেয়ে। একজন চেঁচিয়ে রূঢ় ভাষায় বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে হিজাব পরিহিতা নারীর সাথে। একটু মনোযোগ দিতেই বুঝলাম, মেয়েটি সেই নারীর কন্যা। আমি ভীষণ অবাক হলাম। কেননা, মেয়েটির সংক্ষিপ্ত পোশাক, আচরণ, মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার কোনভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মেলাতে পারছিলাম না।
এ বছর বসন্তের শুরু কেবল। কেউ কেউ বাগান করার পূর্ব প্রস্তুতি শুরু করেছে। গত সপ্তাহের এক বিকেলে ছেলেকে মসজিদে দিয়ে ফিরবার পথে সেই নারীকে তাঁর বাড়ির সামনের মাটি খুঁড়তে, পরিস্কার করতে দেখে কুশল বিনিময় করি। কন্যা’দের কথা জিজ্ঞেস করি। বললেন, ওরা এখানে থাকে না। বড় মেয়েটি আঠারো বছর। স্প্যানিশ বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে চলে গেছে এই বলে যে, ” এ বাড়িতে তাঁর কোন প্রাইভেসী নেই”। ছোট মেয়েটি তেরো বছর। সে-ও কখনো বাড়ি ফিরে, কখনো ফিরে না ! আমি আঁতকে উঠি ! মাত্র তেরো ! আমার বড় ছেলে রিয়াসাত এর ও যে তেরো চলছে ! এর আগে দু’বার এ বাড়িতে এসেছি, গল্প করেছি। বৈকালিক চা পান করেছি। নামাজের ওয়াক্তে মেয়েদের বাবাকে বাড়ির পাশের মসজিদে যেতে দেখেছি। পর্দানশীন মা, পরহেজগার বাবা। এমন পরিবারে এমন বেপরোয়া কন্যা ! বললেন, মেয়েদের সঠিক পথে আনবার জন্যে তিনি তিল তিল করে গড়া ক্যারিয়ার, জব ছেড়ে দিয়েছেন। জীবন যাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন। আমি বুঝি, দেরি হয়ে গেছে। বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে।
বাড়ি ফিরছি। ভাবছি, অন্য শহরে থাকা আমার এক বন্ধুর কথা। গত সপ্তাহে সে জানিয়েছিল, তাঁদের পারিবারিক এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে জামিনে মুক্ত করে আনবার কথা। ভদ্রলোককে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাঁর নিজেরই টিন এজ কন্যার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। কন্যা’র অভিযোগ__ বাবা-মা দিন রাত জব নিয়ে ব্যস্ত থাকে, চার বছর বয়সী ছোট বোনটিকে তাঁর তত্ত্বাবধানে রেখে। তাঁর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, বকাঝকা করে, কখনো কখনো গায়ে হাত তুলে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার শরীর অবশ হয়ে আসে। বাবা-মা’য়ের সাথে সন্তানের এ কেমন সম্পর্ক ! এ কোন দেশে এলাম ! একটু অবসর পেলেই যেখানে আমার বাবা-মা’র কথা মনে পড়ে। বুক ভেঙে কান্না পায়। বাবা-মা’র সাথে থাকার সময়টা আমার এতটুকু জীবনের সেরা সময়। সেই সোনালি সময়টা ফিরে পেতে চাই সবকিছুর বিনিময়ে। অথচ, আজকালকার ছেলেমেয়েদের এ কোন অন্ধকার সময় ! বিকেলের নরম সোনালী আলোয় হেঁটে যেতে যেতে আমার চারিপাশ অন্ধকার লাগে। ভীষণ অন্ধকার !

 

দিনরাত কাজে ডুবে থাকা, ডলারের পিছু ছুটে চলা বাবা-মা’য়ের সন্তানরা একাকি তলিয়ে যাচ্ছে গহীন কূপের অন্ধকারে একটু একটু করে। দেশে থাকতে আমার বাবা-মা দু’জনই ব্যবসা আর চাকুরীর পাশাপাশি সময় দিয়েছেন আমাদের। আমরা দুপুরের, রাতের খাবার একসাথে বসে খেয়েছি। খাবারের টেবিলে হাসি, ঠাট্টা, গল্প, সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা শেয়ার করেছি। আমাদের কখনো বিদেশ ঘুরা হয়নি, এমন কি পাশের দেশ ভারতও নয়। কিন্তু মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় বাবা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন কাপ্তাই, রাঙামাটি, চন্দ্রঘোনা। পাহাড় দেখিয়েছেন। জঙ্গল দেখিয়েছেন। চাকমা রাজবাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন। কিভাবে পেপার তৈরি হয়, কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে… সব, স-ব। অতঃপর সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবার সময় আমার বোনটি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সেবার আর সমুদ্র দেখা হয়নি আমাদের।

 

আমার তেরো বছরের ছেলে রিয়াসাত স্কুল ট্রিপে গেলে মাঝে মাঝে কিছু ডলার হাতে দিয়ে বলি, কিছু খেতে মন চাইলে খেয়ো। সে নেয় না। কিছুতেই নেয় না। বলে, মানি লাগবে না, স্কুল থেকে লাঞ্চ দেয়। এক জোড়া জুতো নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আরেক জোড়া কিনতে রাজি হয় না। আমার মুখে হাসি না দেখলে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, তাঁর কোন আচরণে কষ্ট পেয়েছি কিনা।

 

পাঁচ বছরের ছেলে রিহান প্রতি ভোরে স্কুলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয় যখন, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে শেষ দু’সিঁড়ি উপরে থেমে থাকে। আমি দ্রুত পায়ে নেমে গেলে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠে, আম্মু তুমি জিতেছ। নিজে হেরে গিয়ে মাকে জিতিয়েই তাঁর দিন শুরুর আনন্দ ! আবার দুপুরে স্কুল গেটে আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে বলে, তুমি জানো আমি কি এনেছি তোমার জন্য ? আমি রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বলি, “কি” ? অতঃপর ব্যাগ থেকে আপেল কিংবা কমলা বের করে আনে। জিজ্ঞেস করে, “তুমি লাইক কর”? আমি চোখ গোলাকৃতি করে পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময়, আনন্দ ঢেলে দিয়ে বলি, “তুমি কিভাবে জানলে, আমি এটি লাইক করি” ! সেই সুযোগে রিহান আমার গায়ে গা ঘেঁষে আস্তে করে জেনে নেয়__ তুমি রিহান লাভ করো ? আমি তাঁকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরি, শক্ত করে। ভীষণ ভাবে।বলি, আই লাভ ইউ, বাপ।
এই যে এদের এমন করে ভালোবাসি, আগলে রাখি প্রতিনিয়ত এসব কি বৃথা যাবে ?
এই যে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে ওদের রেখে কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যেও জব করিনি, ডলারের পিছু ছুটিনি__ এর মূল্য শুধু সময়ই জানে, আর জানেন আমার স্রস্টা।
দেশে গেলে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, বিদেশের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই জব না করলে নাকি সংসার চালানো কঠিন। একজনের আয় এ কেমন করে চলে ? আমি বলি, কঠিন নয়। চলা যায়। সুন্দরভাবেই চলা যায়। যদি না অপচয় করি, যদি না বিলাসিতা করি। যদি কৃচ্ছতা সাধন করি। চলতে পারা, না পারা নির্ভর করে শুধুই চাহিদার উপর।
লেখাটি লিখবার সময় চোখ আঁটকে থাকে টেবিলে রাখা পত্রিকায়। নিউইয়র্ক শহরের সেরা হাইস্কুল গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে গত সপ্তাহে।বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্য ঈর্ষনীয়। ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা। যেসব বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের সময় দিয়েছেন, কঠোর পরিশ্রম করেছেন এ আনন্দ কেবলই তাঁদের।

শুভকামনা সকল সন্তানদের ।
শুভকামনা সকল বাবা-মা’কে…

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
মার্চ ২৩, ২০১৬

৪০৭জন ৪০৭জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ