সেদিনটা ওভাবেই চলে গেলো। পরেরদিন সকালে হাসপাতাল যাবো রেডি হয়েছি। রানা ফোন করলো, “কি রে তুই কখন বের হবি?” বললাম এই তো রেডি হলাম। যাচ্ছি নীচে। বললো, “শোন আমি আসছি, নীচে দাঁড়া।” হেসে ফেললাম মনে মনে এখনও সেই একই রানা। রিক্সা নিয়ে এসে বললো, “ওঠ তাড়াতাড়ি।” বললাম তুই না আসতে পারবিনা বললি! বললো ও নাকি এদিক দিয়েই কাজে যাচ্ছিলো, তাই। আচ্ছা এখনও কি আমি অমন আছি যা বলবে তাই-ই বিশ্বাস করবো? চুপ করে রইলাম। বললাম আমার ভয় করছে রে। পড়ে যাবো, একটু ধর আমাকে। সত্যি সে সময় রিক্সায় এতো ভয় হচ্ছিলো! যাক হাসপাতালে নামিয়ে দিয়েই ও চলে গেলো। জয়ী এলো কিছুক্ষণ পর। এমনিতে ও অনেক ছটফটে। অথচ ওখানে এসে ওর একটা অন্যরকম ব্যক্তিত্ত্ব। এই মেয়েটার অন্নপ্রাশনে গিয়েছিলাম, ছোট্ট মেয়েটি নাচতো যা কিছু দেখতো। সাজুগুজু করে এসে কতো মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলতো। এখন ও ডাক্তার। আমি ওকে দেখে গিয়েছিলাম মেডিক্যালে পড়ছে। যাক ও নিয়ে গেলো ডাঃ কৈরীর ওখানে। স্যার তখনও আসেননি। বসলাম অপেক্ষায়। আসার সাথে সাথেই গেলাম, স্বজনপ্রীতি দেশ থেকে কখনই যাবেনা। আর আমরা সকলেই তার সুযোগ নিয়েই যাবো, সেই সময়টায় ভাবলাম ডাঃ কৈরীর সামনেই। সব বললাম, তারপর উনি একটা চিঠি লিখে দিলেন যেনো বাপিকে সরাসরি হাসপাতালে এনে উঠাতে পারি। বের হয়ে এসে জয়ীকে বললাম অনেক বড়ো হয়ে গেছিস। বদলে যাসনা কখনো। বললো, “দিদি আসো তো আমাদের এই ক্যাফের কফি তোমার খুব ভালো লাগবে।” টেনে নিয়ে গেলো। যাবার পর শুধু কফি না, সিঙারা আর কি জানি ভুলে গেছি অর্ডার দিলো। ওহ মনে পড়েছে সকালের খাবার। পরোটা-ডিম-সব্জী। টাকা দিতেই দিলোনা। মনে মনে হাসছিলাম এইটুকুনি মেয়ে এখন আমায় আপ্যায়ণও করে। অনেক কৃতজ্ঞ এই জয়ীর কাছে। ও যা করেছে ওই কয়টা দিন, অনেক দামী গিফট দিয়েও সেই ঋণ শোধ করা যাবেনা।

যাক বাসায় এলাম। আসার পরেই ছোট বোন মৌ বললো, “দিদিভাই আজই একটু সময় আছে, চলো শপিং-এ যাই। বাপি-মামনি ওরা এলে আর পারবে না।” কিন্তু আমার শপিং। দেশে এলাম দু’দিন, এক রাত কেটে গেলো এখনও বাপি-মামনিকে দেখিনি। বললাম না রে ভালো লাগছে না। ওর জোরে আবদারে গেলাম, অপু গাড়ী পাঠিয়ে দিলো। বলে নেই মৌ আর জয়ী একই বয়সী। মৌ খুব পাকা গিণ্ণী। আমার দশ বছরের ছোট, কিন্তু গিণ্ণীপনায় বিশ বছরের বড়ো। তীর্থকে নিয়ে বেশ চলে ওর। ওদের ভিডিও গেম নিয়ে খেলা দেখলে, আরে দুজনেই তখন এক বয়সের হয়ে যায়। যাক তীর্থকেও সাথে নেয়া হলো। রাস্তায় ভীড়, এদিকে ধাক্কা, তো ওদিকে। গাড়ীর ভেতরে থেকেও একটু ভয় পাচ্ছে, তেমনি অবাকও হচ্ছে। মৌ বললো কোথায় যেতে চাই। বললাম খুব নিউমার্কেট-চাঁদনী চক-নীলক্ষেতের ওদিকে যেতে ইচ্ছে করছে। ড্রাইভার বললো মৌকে, “ম্যাডাম তাহলে তো অনেক হাঁটতে হবে আপনাদের। গাড়ী নিয়ে ওখানে যেতে অনেকক্ষণ লেগে যাবে।” মৌ বললো, “দিদি একটা জায়গার কথা বলো। আর সেই দিন নেই যে একদিনে সব ঘুরতে পারবে।” মৌয়ের শরীরটাও ভালো ছিলোনা। তাও বেশ খেটেছে। যাক চাঁদনী চক গেলাম। তাও হাঁটতে হলো হকার্স মার্কেট থেকে। মৌ বললো টাকা যেনো সাবধানে রাখি। সত্যি ভুলেই গিয়েছিলাম ওসব কথা। কপালের ফের যে দোকানে ঢুকি দোকানদার বলে, “আপা দেশের বাইরে পার্টি বেশী হয়, এই শাড়ীটা নতূন এসেছে। এটা নেন আপনে।” মৌ বললো, “দিদি তোমায় নিয়ে হয়েছে বিপদ। সাথে ওটা(তীর্থর কথা বলছে)কেও দেখে বুঝে নিয়েছে। কি যে জ্বালা!” এরপর মৌ বেশ ট্রেনিং দিলো তীর্থকে। যাক বেশ কেনাকাটা হলো। মৌ বললো কি খেতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম ফুচকা। উফ ফুচকা এতো টানে কেন আমায়? তিনবেলা ফুচকা খেয়ে থাকতে পারবো, এতোটাই প্রিয়। আর সত্যি এমনও হয়েছে ফুচকা খেয়ে আর কিচ্ছু খাইনি। গেলাম ফুচকা খেতে নিউমার্কেটের সেই দোকানটায়, যেদিকে চশমার দোকানগুলো আছে। ধ্যত্তের ভুলে গেছি। ফুচকার ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গেই বান্ধবী ঊর্মী-শিল্পী দুজনকে পাঠালাম মৌয়ের সেলফোন থেকে। তখনও আমার ফোন আসেনি হাতে। ইস লিখতে গিয়েই তো ইচ্ছে করছে ছুট দিতে। বাসায় এলাম ফিরে। সন্ধ্যের সময় অপু আসতেই বললাম ওকে আমার পুরোনো একটা সেলফোন ছিলো এই দেশে থাকা অবস্থাতেই, সাথে পুরোনো সিম কার্ডটাও। কি করবো? ওর কথায় গেলাম মৌয়ের সাথে পাশেই গ্রামীণের দোকানে সিমকার্ডটা এক্টিভেট করলাম। প্রথমেই জানালাম জিসান নানাকে, কি যে ভালো লাগলো পরিচয় না দিয়েও ফোনটা দিতেই নানা বললো, “নাত্নী কেমন আসোস?” অবাক হয়ে গেলাম। এতো বছর পর আমার কন্ঠ কি করে বুঝলো নানা? ভালোবাসা কেন পাই আমি এতো, কেন? এতো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই খুব সত্যি। যাক  কাটলো সেই রাতটা। কি ভয়ানক! রাতে ঘুম নেই। কানাডায় ব্যবহৃত সেলফোনটায় ওয়াই-ফাই আসতো, তাই রক্ষা! ঊর্মী-শিল্পী ওদেরকে ম্যাসেজ করতাম। কিন্তু ওরা তো ব্যস্ত। ঊর্মী বকতো, আবার ও-ই আদর ড়োকরে বলতো, “তুই বেড়াতে গেছিস, আমি কাজে। বুঝিস না কেন? ফ্রী হয়ে কল দিচ্ছি।” আজ এই যে লিখছি দেশভ্রমণ নিয়ে ওর আব্দারেই কিন্তু। ওর ভালোবাসার যত্ন করতে পারিনি আমি, অথচ আমার আজকের এই প্লাটফর্মটা ওরই তৈরী।

এবার আসি হাসপাতালের কথায়। দেশে যে কয়দিন ছিলাম, আমার বাসস্থান হয়ে গিয়েছিলো গ্রীনলাইফ হাসপাতাল। যে কেবিনটা নিয়েছিলাম, ওখানেই মোটামুটি দিন-রাত। যাক বাপি-মামনি ওরা রওয়ানা দিয়েছিলো বড়ো মামা-মামীর সাথে। আর এম্বুলেন্স ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছিলো সেই মৌলভীবাজার থেকে। মামা-মামী যথেষ্ট খেটেছে। আমাদের বড়ো মামী এই মানুষটার কথা কি বলবো আর কি বলবো না? কথায় আছেনা বিপদে পড়লেই মানুষ চেনা যায়। ভোরেই ফোন দিলাম বড়ো মামাকে। কখন এসে পৌঁছাবে? বললো মাত্র রওয়ানা হয়েছে, আসতে আসতে দুপুর সাড়ে বারো থেকে একটা বেজে যাবে। জয়ী বললো যদি সকাল দশটার মধ্যে আসতে পারতো, তাহলে সুবিধা হতো। কিন্তু সেটা সম্ভব হবার কথা না। ওদিকে দেশে তখন রাস্তা-ঘাটে বোমাবাজি চলছে। কিছুটা চিন্তা হচ্ছিলো। তবু মন বলছিলো কিচ্ছু হবেনা। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা আর তো কিছুক্ষণ বাপি-মামনিকে দেখবো। চোখে ভাসছে বাপির হাসি, মামনির জড়িয়ে ধরা। মামনির কাছে তীর্থ বেশী পাত্তা পায়, আমি না  🙁  । যাক আবার ফোন দিলাম তর সইছে না। জীবনে মানুষ যে কয়টির জন্যে অপেক্ষা করে বেশী সেসব হলো, ছাত্রজীবনে পরীক্ষা পাশের ফাঁকি দিয়ে হলেও, প্রেমিক/প্রেমিকার জন্য আর চাকরীর জন্য। ভুল বললাম কি? কিন্তু এ অপেক্ষা বড়ো অন্যরকম। নিঃস্বার্থ-মিষ্টি-আদুরে-কোমল অপেক্ষা। অবশেষে মামাকে আবার ফোন কোথায়? বললো হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ঢুকছে। সিঁড়িটার সামনে এসে উচ্ছ্বাসটা কেমন জানি হয়ে গেলো। মামনির কান্না দেখিনি,  বাপিকে স্ট্রেচারে নামানো হচ্ছে। আমার দিকে চেয়ে আছে। বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিলো, হেসে বললাম বেশ খেলা দেখালে! এতো বছর পর এলাম কই একটু নাচ-গান করবো, ঘুরবো-বেড়াবো। চোখের কোণা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল, বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে শব্দহীন কেঁপে কেঁপে কান্না বাপির। যে বুকটায় ঝাঁপিয়ে পড়তাম, তাকেই টেনে নিলাম মা হয়ে। আমার বড়ো বাচ্চাটা। কপালে একটা চুমু দিয়ে বললাম পাগল নাকি তুমি? কাঁদছো কেন? জানোই তো কান্না দেখলে রাগ হয় আমার। এই তো আমি এসেছি, থাকবো। হাসি দেও।

গহীন উষ্ণতর আবেগ (আমাদের চশমা পরিবার কিন্তু)
গহীন উষ্ণতর আবেগ

বাবা, আচ্ছা ওই যে আকাশের তারাগুলো ওরা কেন অনেক দূরে?
জানো আজ না চড়ুই পাখীটা জানালায় এসেছিলো, ভয় পায় কেন আমায়?
ধরতে গেলেই কি মারবো?
নাইটকুইন নাম রাতে ফোঁটে বলে, ভোরে যে ফোঁটে সানফ্লাওয়ার;
ওর নাম কেন সানকিং না?
প্রশ্নগুলো উত্তর পেয়েছিলো প্রাণখোলা হাসির ঝঙ্কারে।
বাবা আজকাল বড়ো কঠিন কঠিন প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, জানো? শুনবে? না শুনলেও করবো প্রশ্নগুলো।
আচ্ছা উষ্ণতার কোনো শব্দ কি আছে?
গহীনের ভেতরের নৈঃশব্দ কি সেই শব্দ শোনে?
একাকী যন্ত্রণা কখনো কেন হৈ-হুল্লোড়ে আছড়ে পড়েনা?
একটা অথৈ নীল সমুদ্র আবেগের বিশালতার কাছে জয়ী কেন হয় বাবা?
রোজ একটু একটু করে হেরে গিয়ে আবার বেঁচে থাকি কেন?
বলোনা উত্তরগুলো।
শোনো কথায় বলা লাগবে না, শুধু সেই প্রাণখোলা হাসিটুকু দাও।
দেবে সেই হাসি? সেই গল্প করা সময়গুলো দেবে?

টেলিফোনটা ভালো না, খুব পঁচা। সে বুঝতেই চায়না তোমার স্পষ্ট কথা শোনার জন্যে কতো ইচ্ছে যে তোলপাড় করে মন।

ক্রমশ…

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৭ আগষ্ট, ২০১৫ ইং।

৫১২জন ৫১২জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ